বরিশালের বিস্তীর্ণ মাঠ এখন এক মায়াবী হলুদের রাজ্যে পরিণত হয়েছে। যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই কেবল সূর্যমুখী ফুলের উজ্জ্বল উপস্থিতি। প্রকৃতি যেন নিজ হাতে পুরো অঞ্চলকে সাজিয়ে তুলেছে এক প্রাণবন্ত সাজে।
চলতি মৌসুমে বরিশাল বিভাগে সূর্যমুখী চাষে আশাতীত সাফল্য এসেছে, যা কৃষি বিভাগের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাপিয়ে গেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ বছর বিভাগে সূর্যমুখী চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮ হাজার ৫৭৭ হেক্টর জমি। কিন্তু কৃষকদের ব্যাপক আগ্রহের কারণে ৯ হাজার ২৬৮ হেক্টর জমিতে এ ফসল চাষ হয়েছে।
লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার এই চিত্র কেবল সংখ্যাতাত্ত্বিক অর্জন নয়, বরং এটি কৃষকদের আত্মবিশ্বাস ও নতুন সম্ভাবনার প্রতীক।
অনুকূল আবহাওয়া, তুলনামূলক কম উৎপাদন খরচ এবং অধিক মুনাফার হাতছানি মূলত কৃষকদের এই ফসল চাষে আগ্রহী করে তুলেছে। বরিশাল অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি জেলাতেই এখন সূর্যমুখীর চাষ ছড়িয়ে পড়েছে।
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এ বছর পটুয়াখালী জেলায় সবচেয়ে বেশি জমিতে সূর্যমুখীর আবাদ হয়েছে। এছাড়া বরগুনা, ভোলা, পিরোজপুর, ঝালকাঠি ও বরিশাল জেলার মাঠগুলোতেও দেখা মিলছে এই হলুদ ফুলের সমারোহ। অনেক কৃষক এবার প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে এই চাষ শুরু করেছেন। আবার কেউ কেউ গত বছরের ভালো অভিজ্ঞতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে চাষের পরিধি বাড়িয়েছেন।
বরিশাল সদর উপজেলার কৃষক আবুল হোসেন জানান, তিনি প্রতি বছরই নিয়মিতভাবে সূর্যমুখী চাষ করেন। তবে এ বছর লাভের প্রবল সম্ভাবনায় তিনি পাশের জমিতেও চাষের বিস্তার ঘটিয়েছেন। অনুকূল পরিবেশ আর ভালো ফলন দেখে তিনি আশাবাদী যে, এবার খরচ বাদে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মুনাফা তার ঘরে উঠবে।
অন্যদিকে বাবুগঞ্জ উপজেলার কৃষক শিবলু দাস বলেন, আগে তার অনেক জমি পতিত পড়ে থাকত। এখন সেই পরিত্যক্ত জমিতেই তিনি সূর্যমুখী চাষ করে স্বচ্ছলতার মুখ দেখছেন। গত বছরের তুলনায় এবার তিনি অনেক বেশি জমিতে আবাদ করেছেন।
তিনি আরও জানান, এই চাষে খরচ যেমন কম, তেমনি লাভের অংক বেশ বড়। বিশেষ করে বিভিন্ন তেল উৎপাদনকারী কোম্পানির লোকজন সরাসরি জমি থেকে বীজ কিনে নিয়ে যাওয়ায় বাজারজাতকরণ নিয়ে তাকে কোনো দুশ্চিন্তা করতে হচ্ছে না।
কৃষকদের অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, মাত্র আড়াই হাজার টাকার বীজ বপন করে সেখান থেকে প্রায় ৩০ হাজার টাকা মূল্যের তেল পাওয়া সম্ভব। এই অভাবনীয় হিসাবই সূর্যমুখীকে আজ একটি সাধারণ ফসল থেকে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করেছে।
বরিশাল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক ড. নজরুল ইসলাম এই উদ্যোগ নিয়ে অত্যন্ত আশাবাদী। তিনি জানান, সূর্যমুখী চাষ বাংলাদেশের ভোজ্য তেলের বাজারে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে। বরিশাল অঞ্চলে ইতিমধ্যেই এই ফুল থেকে তেল উৎপাদন শুরু হয়েছে, যা দেশের ভোজ্য তেলের আমদানিনির্ভরতা কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
কৃষকদের এই বর্তমান আগ্রহ ধরে রাখতে পারলে আগামীতে এ চাষ আরও বড় পরিসরে বিস্তৃত হবে বলে তিনি মনে করেন।
বর্তমান সময়ে সূর্যমুখীর এই সুবিশাল মাঠ কেবল কৃষকের আয়ের উৎস হিসেবেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি হয়ে উঠেছে প্রকৃতিপ্রেমী ও পর্যটকদের নতুন গন্তব্য। দর্শনার্থীদের মতে, সূর্যমুখীর বাগানে প্রবেশ করলে মনে হয় যেন কোনো এক হলুদের স্বপ্নরাজ্যে তারা চলে এসেছেন। চারদিকে ফুলের সমুদ্র আর তার মাঝে মৌমাছিদের আনাগোনা পুরো পরিবেশকে এক জীবন্ত চিত্রকল্পে পরিণত করেছে। বড় বড় বাগানগুলোতে দাঁড়ালে মনে হয় যেন স্বর্গের কোনো এক খণ্ড জমিতে তারা অবস্থান করছেন।
বরিশালের এই হলুদ বিপ্লব কেবল নয়নজুড়ানো দৃশ্যই নয়, এটি মূলত কৃষকের লালিত স্বপ্নের বাস্তব প্রতিফলন এবং অর্থনীতির নতুন এক সম্ভাবনার দুয়ার। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই উদ্যোগ দেশের ভোজ্যতেলে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পথে একটি উজ্জ্বল ও বলিষ্ঠ পদক্ষেপ।


