গত বছর যখন মিয়ানমারের বিদ্রোহীরা কিয়াউকমের পাহাড়ি শহরটির দখল নিয়েছিল, তখন মনে হচ্ছিল শেষ পর্যন্ত সামরিক জান্তার হাত থেকে ক্ষমতা বুঝি সরেই যাচ্ছে। চীনের সঙ্গে মিয়ানমারের সীমান্ত সংযোগকারী ঐতিহাসিক বার্মা রোডটি এই শহরের পাশেই অবস্থিত। ফলে এর গুরুত্বও বেশি। শহরটি দখলের পর তা’আং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (টিএনএলএ) এই বিজয় নিয়ে ভীষণ উচ্ছ্বসিতও ছিল। বছরের পর বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধের মধ্যে এই জয় তাদের রীতিমতো চাঙ্গা করে তুলেছি।
কিন্তু এই মাসে জান্তা মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে কিয়াউকমে পুনরুদ্ধার করে নেয় । দৈনিক বিমান হামলা চালিয়ে শহরের বড় অংশ মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয় তারা। সেই সঙ্গে কাছের শহর হিসপাও পুনরুদ্ধার করে। আর এর মাধ্যমে চীনের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনকারী গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য করিডোরের উপরও নিয়ন্ত্রণ ফিরে আসে। বিদ্রোহী আর জান্তার এই পাল্টাপাল্টি লড়াই ও দখলের ঘটনা ঘটেছে অত্যন্ত দ্রুত। যা ছিল নৃশংস এবং গভীরভাবে প্রতীকী।
যুদ্ধক্ষেত্রে জান্তার পুনরুত্থান ছিল অনেকটা হকচকিয়ে দেওয়ার মতো। কাচিন রাজ্যে, এই সপ্তাহে জান্তার বিমান বাহিনী মিয়ানমারের জেড খনির কেন্দ্র হপাকান্তের কাছে কাচিন ইন্ডিপেন্ডেন্স আর্মির (কেআইএ) বিরুদ্ধে ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। যেখানে একক আক্রমণে ৩০টি বোমা ফেলা হয়।
শান রাজ্যে জোর করে অন্তত ৬০ হাজার মানুষকে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত এই সেনারা শুধু সংখ্যাতেই ভারসাম্য এনেছে। অন্যদিকে কিয়াউকমে, হিসপাও, লাশিয়ো এবং ডেমোসো জুড়ে, অবিরাম বোমাবর্ষণে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে।
উত্তর মিয়ানমারে ক্ষমতার ভারসাম্য আবার ঝুঁকছে জেনারেলদের দিকে। কারণ চীনের সমর্থন বেড়েছে, যা যুদ্ধক্ষেত্রে পরিবর্তন নিয়ে এসেছে এবং ডিসেম্বরের বিতর্কিত নির্বাচনের আগেই দেশের যুদ্ধের গতিপথ বদলে দিয়েছে।
গত কয়েক মাসের হিসাব-নিকাশের পরেই জান্তার প্রতি চীনের এই নতুন সমর্থন।
টিএনএলএ, মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স আর্মি (এমএনডিএএ) এবং আরাকান আর্মির (এএ) জাতিগোষ্ঠীগত জোট যখন ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স ২০২৩ সালের শেষের দিকে অপারেশন-১০২৭ শুরু করেছিল, তখন বেইজিং সরে দাঁড়িয়েছিল। সেই আক্রমণে ভীষণ অপদস্থ হয়ে পড়েছিল মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং শান রাজ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করে নিয়েছিল বিদ্রোহীররা।
তবে, এখন বেইজিং সেই একই জেনারেলদের সমর্থন করছে যাদেরকে তারা একসময় দূরে ঠেলে দিয়েছিল। ৩০ আগস্ট বিকালে, চীনা কর্মকর্তারা তিয়ানজিন গেস্ট হাউসে জান্তা নেতা মিন অং হ্লাইং এবং শি জিনপিংয়ের মধ্যে দুটি বৈঠকের আয়োজন করেন। যেখান থেকে আসে আসন্ন নির্বাচনের জন্য কারিগরি ও আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি এবং জান্তাকে যুদ্ধযন্ত্র পুনর্নির্মাণে সাহায্যের কথা।
আগস্টে মিয়ানমার সফরকালে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেন, ‘মিয়ানমারে বিশৃঙ্খলা ও যুদ্ধের বিরোধিতা করে চীন।’
যা বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে গণতন্ত্রের চেয়ে স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কূটনৈতিক ইঙ্গিত। বিশ্লেষকরা বলছেন, জান্তা যখন টালমাটাল অবস্থায় ছিল তখন চীন সামরিক শাসনের চেয়ে রাষ্ট্র পতনের আশঙ্কা বেশি করছিল।
ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের মরগান মাইকেলস বলেন, ‘বেইজিংয়ের নীতি হলো রাষ্ট্রের পতন নয়। তাদের মিয়ানমারের শাসকগোষ্ঠীর প্রতি কোনো ভালোবাসা নেই, কিন্তু যখন মনে হলো সামরিক বাহিনী ভেঙে পড়তে পারে, তখন চীন হস্তক্ষেপ করল।’
চীনের এই প্রভাব শুধু কূটনীতিতেই নয়, আকাশেও দৃশ্যমান। জান্তা তাদের ফ্রন্টলাইনগুলোতে চীনের তৈরি ড্রোন দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছে। একসময় বিদ্রোহীরা দেশে তৈরি ড্রোন দিয়ে হামলা করত, জান্তার এই চীনা ড্রোনের হামলার মাধ্যমে সেই প্রতিরোধ ব্যবস্থাও উল্টে দিয়েছে।
হাজার হাজার মাল্টি-রোটর ড্রোন এবং ফিক্সড-উইং ইউএভি এখন জান্তার আর্টিলারি ফায়ার পরিচালনা করছে। এগুলো নির্ভুলভাবে বিস্ফোরক ফেলছে এবং বিদ্রোহীদের শক্ত ঘাঁটিগুলো খুঁজে বের করছে।
আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা প্রজেক্টের (এসিএলইডি) জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক সু মন বলেন, ‘এই প্রায় অবিরাম ড্রোন হামলার কারণে বিদ্রোহীরা পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছে। যেহেতু তারা ড্রোন দিয়ে হামলা চালাচ্ছে, তাই বিমান হামলাও হচ্ছে ভীষণ নির্ভুলভাবে।’
গত ৯ অক্টোবর চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একটি সিদ্ধান্ত জারি করে। যেখানে উচ্চ-শক্তির লিথিয়াম ব্যাটারি, ক্যাথোড সামগ্রী এবং কৃত্রিম গ্রাফাইটের উপর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। যা দূরপাল্লার ড্রোন পরিচালনার জন্য অপরিহার্য উপাদান। ৮ নভেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া এই নিষেধাজ্ঞা মূলত সেইসব ব্যাটারির জন্য যেগুলো বিদ্রোহীদের ব্যবহৃত ড্রোনে ব্যবহার করা হয়।
এই পদক্ষেপ প্রতিরোধের আকাশপথে ক্ষমতাকে পঙ্গু করতে পারে। গত কয়েক মাস ধরেই চীনের রপ্তানি রড়াকড়ির কারণে জান্তাবিরোধী দলগুলো উপাদান সংগ্রহ করতে হিমশিম খাচ্ছে। প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেড়েছে, চোরাচালানের পথ বন্ধ হয়ে গেছে এবং সামরিক বাহিনীর উন্নত ইলেক্ট্রনিক জ্যামিং সিস্টেম বিরোধীদের ড্রোনগুলোকে আঘাত হানার আগেই ভূপাতিত করছে।
এদিকে, ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের আরেক সদস্য এমএনডিএএ চীনের চাপে নতি স্বীকার করে হামলা বন্ধ করেছে। শক্তিশালী ইউনাইটেড ওয়া স্টেট আর্মি (ইউডব্লিউএসএ) অন্যান্য গোষ্ঠীকে অস্ত্র সরবরাহ করা বন্ধ করে দিয়েছে, যা প্রতিরোধ প্রক্রিয়াকে আরও সঙ্গিন করে তুলেছে।
এমনকি দক্ষিণের প্রভাবশালী গোষ্ঠী কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়ন (কেএনইউ) লে কায় কাওসহ গুরুত্বপূর্ণ শক্ত ঘাঁটিগুলোর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। আগের যুদ্ধবিরতির সময় যা ছিল জাপানের সহায়তায় নির্মিত একটি মডেল শহর। কায়াহ রাজ্যে এরই মধ্যে সেনাবাহিনী ডেমোসো এবং মোবিয়ে পুনরুদ্ধার করেছে। একই সঙ্গে কাচিন এবং সাগাইং অঞ্চলের দিকেও অগ্রসর হচ্ছে।
তবে জেনারেলদের এই পুনরুত্থানের জন্য বেশ ‘ভয়াবহ’ মূল্যে দিতে হয়েছে। পুরো শহরগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা গবেষণা ফেলো মাইকেলস বলেন, ‘সামরিক বাহিনী শুষ্ক অঞ্চল জুড়ে ১ লাখ ১০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। সহিংসতার মাত্রা ছিল ব্যাপক—খুব কম মানুষই আছে যারা এর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।’
জান্তার এই অগ্রগতি একটি নবায়নকৃত রাজনৈতিক লক্ষ্যকে নির্দেশ করে। এটি এমন একটি নির্বাচন মঞ্চস্থের দিকে এগোচ্ছে যাকে বৈধ বলে স্বীকৃতি দেওয়া হবে।
বাণিজ্যিক রুট, সীমান্ত শহর এবং সম্পদের কেন্দ্রগুলো পুনরুদ্ধার করে জেনারেলরা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে এবং সেখানে স্থিতিশীলতা ফিরেছে বলে দাবি করতে চান। জান্তা সরকার বলছে, ডিসেম্বরে মিয়ানমারের প্রায় ৩৩০টি টাউনশিপের সবকটিতেই ভোটগ্রহণ সম্ভব হবে। যদিও বিরোধীরা মনে করেন, অনেক কম স্থানই ভোটগ্রহণের জন্য নিরাপদ।
সম্প্রতি পুনরুদ্ধার করা কিয়াউকমে এবং হিসপাও শহরেও ভোট হওয়ার কথা রয়েছে। সামরিক অভিযানে বিধ্বস্ত এসব শহরে কীভাবে ভোটের আয়োজন করা যেতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
অনেকের কাছেই এই ভোট অন্তঃসারশূন্য বিষয়। অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি নিষিদ্ধ অবস্থায় রয়েছে; লাখ লাখ মানুষ উদ্বাস্তু; বিশাল অঞ্চল সামরিক শাসনের অধীনে রয়েছে। জান্তা নিযুক্ত মিয়ানমারের ইউনিয়ন নির্বাচন কমিশন (ইউইসি) নির্বাচনের জন্য প্রচার র্যালি ও পথসভা নিষিদ্ধ করেছে।
এই নিষেধাজ্ঞার কারণে রাজনৈতিক দলগুলোকে শুধুমাত্র নির্দিষ্ট, অনুমোদিত স্থানে প্রচার চালানোর অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। তবুও চীনের সমর্থন এবং আঞ্চলিক নীরবতার কারণে, জান্তা নির্বাচনের নাটক মঞ্চস্থ করতে চায় যেন, বিশ্বের কোনো শক্তি আর সেখানে হস্তক্ষেপ করতে না পারে।
কিয়াউকমের ধ্বংসাবশেষ থেকে হপাকান্তর বোমা বিধ্বস্ত জেড খনি পর্যন্ত জান্তার প্রত্যাবর্তনের চিহ্ন সেখানে পড়ে থাকা ছাই আর দুঃখের মধ্যেই দৃশ্যমান।
রাখাইন আর চিন রাজ্যেই কিছুটা প্রতিরোধ এখনো টিকে আছে। কিন্তু চীনের সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়ায় এখন বাইরের সমর্থন ছাড়া এসব প্রতিরোধের ভবিষ্যৎ আসলে অন্ধকার।
মাইকেলস বলেন, ‘প্রতিরোধ অব্যাহত রাখতে না পেরে যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য হওয়া এক জিনিস। কিন্তু দেশে শান্তি ফেরাতে রাজনৈতিক দর কষাকষির বিষয়টি মিয়ানমারে এখনো অনেক দূর।’
জেনারেলরা যখন তাদের নির্বাচন মঞ্চস্থ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং বেইজিং যখন বিশৃঙ্খলা দমনের জন্য পদক্ষেপ নিচ্ছে; তখন মিয়ানমারের জনগণ এমন একটি সামরিক বাহিনীর মধ্যে আটকা পড়ে আছে যা তাদের নিজের শহরগুলোকে ধ্বংস করছে। দেশের মানুষ এমন একটি মহাশক্তির অধীনে রয়েছে যা দমন-পীড়নের চেয়ে বিশৃঙ্খলাকে বেশি ভয় পায়।


