চামড়া শিল্পের সাফল্যের গল্পে লুকিয়ে থাকা স্বাস্থ্যঝুঁকি

চামড়া শিল্পের সাফল্যের গল্পে লুকিয়ে থাকা স্বাস্থ্যঝুঁকি
ট্যানারির বর্জ্য মিশ্রিত জলাশয় পার হচ্ছে শিশুরা। ছবি: সৈয়দ মাহামুদুর রহমান/টাইমস
Advertisement
Advertisement

দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছে সাভারের ধলেশ্বরী নদীর তীরে গড়ে ওঠা বিসিক ট্যানারি শিল্পনগরী। গত অর্থবছরে এই চামড়া শিল্প থেকে আয় হয়েছে প্রায় ১১৫ কোটি ডলার। তবে এই বিশাল সাফল্যের আড়ালে ধলেশ্বরী নদীর তীরে জমেছে অসুস্থ শ্রমিক আর দূষিত পানির দীর্ঘশ্বাস। এখানকার মৃতপ্রায় গাছ এবং ঝুঁকিতে থাকা নতুন প্রজন্ম এক গভীর স্বাস্থ্য সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তেঁতুলঝোড়া এলাকার বাসিন্দা রানী দাশের পাঁচ বছরের ছেলে দিগন্ত কয়েক মাস আগে বাড়ির পাশের একটি ছোট জলাশয়ে খেলতে নেমে অসুস্থ হয়ে পড়ে। কাদাপানিতে নামার কয়েক দিনের মধ্যেই শিশুটির শরীরে ফোসকার মতো গোটা ওঠে। দ্রুত স্থানীয় চিকিৎসকের পরামর্শে সে সুস্থ হলেও তার শরীরে এখনো কালো দাগ রয়ে গেছে।

রানী দাশ জানান যে তারা বাড়ির টিউবওয়েলের পানি ব্যবহার করলেও অসচেতনতার কারণে শিশুটি জলাশয়ের পানির সংস্পর্শে গিয়েছিল।

ট্যানারি শিল্পনগরীর ভেতর ও বাইরে শ্রমিকদের অসচেতনতা চরম পর্যায়ে রয়েছে। ৩৫ বছর বয়সী শ্রমিক তোফাজ্জল মিয়া কোনো সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াই খোলা জায়গায় চামড়া শুকাচ্ছেন। মাস্ক বা গ্লাভস কেন নেই জানতে চাইলে তিনি জানান, ছোটবেলা থেকেই তিনি এখানে এভাবেই কাজ করে সুস্থ আছেন।

রুবেল ও জয়নাল নামের দুই শ্রমিককে ধলেশ্বরীর দূষিত পানিতে দাঁড়িয়ে চামড়ার বস্তা ধুতে দেখা যায়। তারা জানান, বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় তারা এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ বেছে নিয়েছেন। কাজ শেষে ডিটারজেন্ট দিয়ে হাত ধুয়ে নিলেই তারা নিরাপদ বোধ করেন।

লংকারচর এলাকার বাসিন্দা লিপা আক্তারের পরিবার এই শিল্পের সাথে জড়িত নয়। তবুও নদী পার হওয়ার সময় বাতাসের তীব্র দুর্গন্ধে তার শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।

লিপা আক্তার জানান, তার শ্বশুর আগে নিয়মিত নদীতে মাছ ধরতেন। কিন্তু বর্তমানে বর্জ্যের কারণে নদীতে মাছ পাওয়া যায় না। আশপাশের গাছগুলোও মারা যাচ্ছে।

আরও পড়ুন

অন্যদিকে ২৬ বছর বয়সী রফিক ২০২০ সাল থেকে ট্যানারি শিল্পে কাজ করছেন। তিনি অভিযোগ করেন, কোম্পানি থেকে দেওয়া সুরক্ষা সরঞ্জাম যথেষ্ট নয়। রাসায়নিকের সংস্পর্শে কোনো আঘাত পেলে সেখানে চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকে না। অনেক সময় শ্রমিকের চিকিৎসার জন্য সুদে টাকা ধার করতে হয়।

বৈজ্ঞানিক গবেষণাগুলো এই শ্রমিকদের করুণ দশার সত্যতা নিশ্চিত করছে। আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’-এর তথ্য অনুযায়ী এখানকার ৩১ থেকে ৫১ শতাংশ শ্রমিক ত্বকের রোগে আক্রান্ত। প্রায় ৪৪ শতাংশ শ্রমিক শ্বাসকষ্টে ভুগছেন।

২০২৫ সালের অন্য একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৭৪ শতাংশ শ্রমিক স্ক্যাবিসে আক্রান্ত। ৬৯ শতাংশ শ্রমিকের নখের রং বদলে গেছে এবং প্রায় ৬০ শতাংশ শ্রমিক আর্টিকেরিয়ায় ভুগছেন। এত ঝুঁকি সত্ত্বেও মাত্র ২৬ শতাংশ শ্রমিক গ্লাভস ও মাস্ক ব্যবহার করেন।

‘আর্থ’ সাময়িকীতে প্রকাশিত ধলেশ্বরী নদীর পানির মান বিশ্লেষণ আরও ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। নদীর পানিতে মোট দ্রবীভূত কঠিন পদার্থের পরিমাণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ অত্যন্ত কম হওয়ায় জলজ প্রাণী বাঁচতে পারছে না। ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়াম ও নিকেলের মাত্রা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ছাড়িয়ে যাওয়ায় পরিবেশগত ঝুঁকি এখন বিপর্যয়কর পর্যায়ে পৌঁছেছে।

সাভার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. মো. সাইদুল ইসলাম জানান, তার কাছে আসা প্রতি ১০০ জন শ্রমিকের মধ্যে ৯০ থেকে ৯৫ জনই চর্মরোগে আক্রান্ত। শ্রমিকদের মধ্যে অ্যালার্জি, একজিমা ও নখের সংক্রমণ নিয়মিত দেখা যাচ্ছে।

নারী শ্রমিকদের গর্ভাবস্থায় জটিলতা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করে সাইদুল ইসলাম বলেন, নিয়মিত স্বাস্থ্যশিক্ষা ও সুরক্ষা সরঞ্জামের ব্যবহার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

পরিবেশবিদ আতিক রহমান বলেন, দূষণ এখন আর শুধু নদীতে সীমাবদ্ধ নেই। শিল্প বর্জ্যের রাসায়নিক দূষণ আশপাশের প্রকৃতি ও গাছপালার বৃদ্ধি ব্যাহত করছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দূষিত হওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম জানান,  অপরিশোধিত রাসায়নিক সরাসরি নদীতে মেশায় পানির গুণমান সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। বিষাক্ত ধূলিকণা বাতাসের মাধ্যমে আশপাশে ছড়িয়ে পড়ছে। তিনি মাটি দূষণ নিয়ে জরুরি গবেষণার ওপর জোর দেন।

চামড়া শিল্পে একটি শিশুর গায়ের দাগ কিংবা শ্রমিকের ঋণের বোঝা এখন বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। ট্যানারি শিল্পনগরীর এই পরিবেশগত বিপর্যয় অর্থনৈতিক অগ্রগতির আড়ালে এক ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি করছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এখনই কঠোর পদক্ষেপ না নিলে পরিবেশের এই বিশাল ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad