উত্তরের পিছিয়ে পড়া জেলা গাইবান্ধার চরের মানুষের প্রাথমিক শিক্ষায় সরকারি ব্যবস্থাপনা শিক্ষকদের কারণে কাজে আসছে না। চরের বাসিন্দাদের অভিযোগ, এমনিতেই শিক্ষকদের পদের একটি বড় অংশই শূন্য। তারপরও যারা দায়িত্বে আছেন, তারাও ঠিক মতে আসেন না। অনেকে অনুপস্থিত মাসের পর মাস। কিন্তু একদিন গিয়ে হাজিরা খাতায় অনেক দিনের সই দিয়ে আসেন।
শিক্ষক নিজে পাঠদান না করে, অন্য একজনকে দিয়ে পাঠদান করান, এমন অভিযোগও আছে। এসব কারণে শিক্ষার্থীরা স্কুলমুখী হতে চায় না। ফলে চারটি উপজেলায় ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও তিস্তাসহ বিভিন্ন নদ-নদীর বুকের ১৬৫টি চরের শিশুরা কার্যত শিক্ষার বাইরে।
শিক্ষকরা বলছেন, শুকনো মৌসুমে নদী পার হয়ে মাইলের পর মাইল হাঁটা আর বর্ষা মৌসুমে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উত্তাল নদী পাড়ি দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছানোর পর মানসিক বিপর্যয় ঘটে। এতে করে পাঠদানে মানসিকতা তাদের হারিয়ে যায়।
চর অধ্যুষিত চারটি উপজেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১১৬টি। এর মধ্যে ফুলছড়িতে সর্বাচ্চ ৫৮টি, সুন্দরগঞ্জে ৩০টি, গাইবান্ধা সদরে ১৫টি ও সাঘাটায় ১৩টি। এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংখ্যা ৪৭২, আর শূন্যপদে ২২৪টি।
প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় দুই হাজার ৯১৫ জন। ফুলছড়ি উপজেলার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এড়েন্ডাবাড়ী ধলীপাটাধোয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। কিন্তু দুর থেকে বোঝার কোনো উপায় নেই এটি একটি শিক্ষালয়। চার কক্ষের একটি ঘর। সম্প্রতি একদিন গিয়ে দেখা যায়, অফিস কক্ষে প্রধান শিক্ষক লডলিস সুলতানা আর সহকারী শিক্ষিকা মারুফা আকতার, নুরজাহান লায়লা ও নৈশ প্রহরী মমিনুর গল্প করছেন। দুপুর ১২টায় কোনো শিক্ষার্থী নেই।
সংবাদকর্মী আসার খবরে শুরু হয় বাড়ি বাড়ি ছোটাছুটি। এক ঘণ্টায় চারজন শিক্ষার্থী সংগ্রহ করা যায়। কিন্তু হাজিরা খাতায় শিশু শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৭৭ জন।
চরের বাসিন্দা গৃহিণী শাহিনুর বেগম বলেন, ‘শিক্ষকরা না আসলে বাচ্চারা স্কুলে যাবে? শিক্ষকরা মাসে ১০-১৫ দিন পর পর আসেন। এতে ছাত্র ছাত্রীরা থাকবে? এজন্য ছেলেদেরকে শহরে পড়ার জন্য পাঠিয়েছি।’
আরেক বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘শিক্ষক আসলে ছাত্র আসে না আর ছাত্র আসলে শিক্ষক আসে না। এভাবেই চরে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো চলছে।’
প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষার্থী আনা সম্ভব? তা ছাড়া গাইবান্ধা জেলা শহর থেকে যাতায়াত করতে কী পরিমাণ সময় লাগে আপনারা সেটা তো জানেন। এখানে দুই জন নারী শিক্ষক আছেন। তাদেরই বা কী বলব। সবারই তো একই সমস্যা। সবাই আমরা কষ্ট করে নদীর বালু-পানি পার হয়ে আসি।’
সদর উপজেলার চিতুলিয়া চর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪০ জন, কিন্তু কোনো শিক্ষক নেই। রহিম নামে এক যুবক ক্লাস নিচ্ছেন।
জানা গেল, সেখানে কেবল একজন প্রধান শিক্ষক আছেন। তিনি সেদিন দাপ্তরিক কাজে উপজেলা শিক্ষা অফিসে অবস্থান করছিলেন।
যাতায়াতের অসুবিধার কারণে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষকদের পোস্টিং দিলে কেউ যোগদান করেন না। আর কেউ যোগদান করেই দুই মাসের মধ্য অন্য বিদ্যালয়ে চলে যান। প্রধান শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘আপনাদের কাছে অনুরোধ, শিক্ষক সংকট নিয়ে একটু লিখুন। আমি উপজেলায় দাপ্তরিক কাজে গেলেই, একটি ছেলেকে রেখে যেতে হয়। কাউকে না রেখে গেলে, স্কুলটি একেবারে বন্ধ থাকবে।’
চরের আরেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেবলাগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এখানে শিক্ষার্থী থাকলেও মাত্র দুইজন শিক্ষক। স্থানীয়দের অভিযোগ, তারাও নিয়মিত আসেন না।
স্থানীয় বাসিন্দা শফিকুল সরকার বলেন, ‘শিক্ষকরা যাতায়াতের মধ্য দিয়ে সময় পার করেন।’
সুন্দরগঞ্জ উপজেলার লালচামার চর ভাটি বুড়াইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বেলা সাড়ে ১১টায় গিয়ে কোনো শিক্ষককে পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, শিক্ষকরা মাসে দুই একবার যান। সেখানে শিক্ষার্থীও নাই বললেই চলে।
স্থানীয় বাসিন্দা আবু হাসান বলেন, ‘স্যাররা ইচ্ছামতো যাওয়া আসা করেন। আমরা বললেই বলেন, ‘নৌকা ছাড়তে দেরি হইছে, উপজেলায় কাজ ছিল, এমন নানা অযুহাত দেয়।’
জানতে চাইলে ফুলছড়ি উপজেলার সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আবু সুফিয়ান বলেন, ‘চরে যাতায়াতের সমস্যার কারণে সব স্কুল পরিদর্শন করা সম্ভব হয় না।’
তিনি জানালেন, কেবল শিক্ষক নয়, সংকট শিক্ষা কর্মকর্তারও। উপজেলায় ছয়জন সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাজ করতে হচ্ছে দুইজনকে। ‘তারপরও যে যে স্কুল গুলোতে সমস্যা, সেগুলো দেখার চেষ্টা করব’, বলেন তিনি।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা লক্ষণ কুমার দাস বলেন, ‘চরের বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকরা যেতে চান না। যারা চরে পোস্টিং নেয়, তারা যাতাযাতের সমস্যাসহ নানান অজুহাত দেখায়। তদবির করে তারা অন্যত্র বদলি হয়ে যান।’
কেউ ইচ্ছা করে স্কুলে না গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, ‘স্থানীয় অবিভাবক ও গণ্যমান্য ব্যক্তি সচেতন হলে ও সহযোগিতা করলেই শিক্ষকদের ক্লাস ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ থাকবে না। এতে করে প্রাথমিক শিক্ষার মান অনেকটা অগ্রসর হবে।’


