বন্দরনগরী চট্টগ্রাম ও এর আশপাশের জেলাগুলোয় ভাড়ায় খুন করা পেশাদার খুনিদের তৎপরতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বেশ কয়েকজন শুটার বা মাঠপর্যায়ের খুনিকে গ্রেপ্তার করতে পারলেও, এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনের মূল পরিকল্পনাকারী ও অর্থদাতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে গেছেন।
এই বিপজ্জনক প্রবণতার সর্বশেষ চিত্র দেখা যায়, গত ১৩ জুন যুবদল নেতা মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদকে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা। তদন্তকারীরা একে পেশাদার ‘কনট্রাক্ট কিলিং’ বা ভাড়ায় খুন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
তদন্ত ও অপরাধের ধরন
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও রাউজান থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ রাজেত জানান, হামলাকারীদের সঙ্গে নিহত মাসুদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক বা স্থানীয় কোনো বিরোধ ছিল না। মাসুদের বাড়ি রাঙ্গুনিয়া এলাকায়, অথচ হামলাকারীরা এসেছে রাউজানের বিভিন্ন এলাকা থেকে। এ থেকেই স্পষ্ট যে এটি একটি চুক্তিভিত্তিক হত্যাকাণ্ড। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে এই মিশনে অংশ নেওয়া পাঁচ সশস্ত্র খুনিকে শনাক্ত করা হয়েছে। মামলায় ১১ জনকে আসামি করা হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র দুজনকে গ্রেপ্তার করা গেছে, মূল সন্দেহভাজনরা এখনো পলাতক।
এর আগে গত ১০ মে নগরীর রউফাবাদ এলাকায় মোহাম্মদ হাসান রাজু নামে রাউজানের এক যুবককে গুলি করে হত্যা করা হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই হত্যাকাণ্ডেও ভাড়াটে অপরাধীরা জড়িত ছিল। রাজুর পরিবারের দাবি, হামলাকারীদের সঙ্গে রাজুর কোনো পূর্বপরিচয় বা শত্রুতা ছিল না। এ ঘটনায় বায়েজিদ বোস্তামী থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন রাজুর মা। তদন্তে দেখা যায়, হামলাকারীরা রাউজান, ফটিকছড়ি এবং নগরীর চান্দগাঁও ও ২ নম্বর গেট এলাকার একটি ভাড়াটে অপরাধী চক্রের সদস্য।
তদন্তকারীরা বলছেন, সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে একটি সাধারণ মিল দেখা যাচ্ছে—তা হলো, ভুক্তভোগী বা শিকারের সঙ্গে খুনিদের সরাসরি কোনো যোগাযোগ থাকে না। নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকার বিনিময়ে পেশাদার অপরাধীরা এই মিশনগুলো বাস্তবায়ন করছে। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, গত বছরের ৭ অক্টোবর রাউজানে আবদুল হাকিম নামের এক ব্যক্তিকে হত্যার ঘটনায়ও ভাড়াটে খুনিদের জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। আদালতে গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতেও বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
সিন্ডিকেট ও রাজনৈতিক যোগসূত্র
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো জানায়, চট্টগ্রামের বেশ কয়েকজন শীর্ষ ও কুখ্যাত অপরাধীকে এখন বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত বিরোধে ভাড়াটে খুনি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। একাধিক হত্যা মামলার আসামি হওয়া সত্ত্বেও এই অপরাধীরা নিজেদের বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। এই চক্রের কোনো শুটার গ্রেপ্তার হলে দ্রুতই নতুন সদস্য এনে সেই শূন্যস্থান পূরণ করা হয়।
বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে কেবল রাউজান এলাকাতেই অন্তত ২৪ জন খুন হয়েছেন। এসব ঘটনার বেশির ভাগই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও প্রতিশোধ নেওয়ার কোন্দলের সঙ্গে যুক্ত। অভিযোগ রয়েছে, এসব হত্যাকাণ্ডের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভাড়াটে অপরাধীদের ব্যবহার করা হয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, ভাড়ায় খুনের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো খুনি ও লাশের মধ্যে কোনো সরাসরি সম্পর্ক না থাকা। এর ফলে হত্যাকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্য এবং নেপথ্যের কুশীলবদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে, যা বিচারপ্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করে। পুলিশ প্রশাসন বিভিন্ন শ্রেণির অপরাধীদের তালিকা তৈরি করলেও ‘ভাড়াটে খুনি’দের জন্য আলাদা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক তালিকা এখনো নেই।
শীর্ষ অপরাধীদের ভূমিকা
চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম জানিয়েছেন, ভাড়ায় খুনের সঙ্গে জড়িতদের ব্যাপারে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে এবং তাদের ওপর নজরদারি চালানো হচ্ছে। যুবদল নেতা মাসুদ হত্যাকাণ্ডে ভাড়াটে খুনিদের জড়িত থাকার প্রমাণ মেলার কথা নিশ্চিত করে তিনি বলেন, জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, রাউজানের শীর্ষ সন্ত্রাসী মোহাম্মদ রাইহানের নাম সবচেয়ে বেশি মামলায় উঠে এসেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নগর ও জেলার বিভিন্ন থানায় তার বিরুদ্ধে আটটি হত্যাসহ মোট ১৬টি মামলা হয়েছে। তদন্তকারীদের কাছে তথ্য রয়েছে যে, কুখ্যাত এই সন্ত্রাসী টাকার বিনিময়ে একাধিক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, যুবদল নেতা মকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদকে খুন করার জন্য ৫০ লাখ টাকার চুক্তি করা হয়েছিল। স্থানীয় এক চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী এই খুনের চুক্তি করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আর রাইহানের দল এই মিশন সফল করে। রাইহান এর আগে বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে ‘বিগ সাজ্জাদ’-এর হিটম্যান (খুনি) হিসেবে কাজ করতেন। তবে এখন রাইহান নিজেই একটি স্বাধীন গ্যাং বা বাহিনী গড়ে তুলেছেন।
চট্টগ্রামে এভাবে একের পর এক সহিংসতা চলতে থাকায় ক্ষোভ ও প্রশ্ন তুলছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। শুটাররা ধরা পড়লেও মূল পরিকল্পনাকারী ও অর্থদাতারা কেন অধরা থেকে যাচ্ছে—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা। তাঁদের আশঙ্কা, এই মাস্টারমাইন্ড বা পরিচালকদের আইনের আওতায় আনা না গেলে চট্টগ্রামে ভাড়ায় খুনের এই ‘ব্যবসা’ দিন দিন আরও সম্প্রসারিত হবে।


