চট্টগ্রামে এবারের কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে পশু উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। গোখাদ্য, ওষুধ, শ্রমিকের মজুরি এবং জ্বালানি তেলের দামসহ সামগ্রিক উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
গত বছরের তুলনায় চট্টগ্রামে পশু উৎপাদন কমেছে প্রায় ৯ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, এই উৎপাদন ঘাটতির প্রভাব কোরবানির পশুর বাজারে পড়তে পারে।
জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ বছর চট্টগ্রাম মহানগর ও বিভিন্ন উপজেলায় মোট ৭ লাখ ৮৩ হাজার ১৫১টি গবাদিপশু কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৮ লাখ ৬০ হাজার ৮৮২টি। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে চট্টগ্রামে পশু উৎপাদন কমেছে ৭৭ হাজার ৭৩১টি।
উৎপাদনের এই নিম্নমুখী প্রবণতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২২ সালে উৎপাদন ছিল ৭ লাখ ৯১ হাজার ৫০১টি, যা ২০২৩ সালে বেড়ে ৮ লাখ ৪২ হাজার ১৬৫টি এবং ২০২৪ সালে ৮ লাখ ৫২ হাজার ৩৫৯টিতে দাঁড়িয়েছিল। তবে বিগত কয়েক বছরের এই ধারাবাহিকতা ভেঙে চলতি বছর উৎপাদন কমে গেছে।
পশুভিত্তিক পরিসংখ্যানেও এই চিত্র স্পষ্ট। এ বছর চট্টগ্রামে ৪ লাখ ৯৯ হাজার ২৭৯টি গরু উৎপাদন হয়েছে, যা গত বছর ছিল ৫ লাখ ৩৫ হাজার ৮১৩টি। ছাগল উৎপাদন ২ লাখ ৫১ হাজার ৭৪টি থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯৪ হাজার ৫১৯টিতে। একইভাবে মহিষের সংখ্যা ৬৪ হাজার ১৬৩ থেকে কমে ৪৭ হাজার ৮৩৪ এবং ভেড়ার উৎপাদন ৫৫ হাজার ৬৯৭ থেকে কমে ৪১ হাজার ৪২৩টিতে নেমেছে।
খামারিদের দাবি, উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রধান কারণ গোখাদ্যের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি। বাজারে সঠিক তদারকির অভাবে স্বল্প সময়ে খাদ্যের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে বলে তারা অভিযোগ করেন। এর সঙ্গে শ্রমিকের বাড়তি মজুরি ও বিদ্যুৎ সংকটে জেনারেটর চালানোর বাড়তি খরচ যুক্ত হওয়ায় খামার পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সীতাকুণ্ড উপজেলার রূপালি এগ্রোর ব্যবস্থাপক মিজানুর রহমান জানান, জ্বালানি, শ্রমিক এবং খাদ্যের উচ্চমূল্যের কারণে তাদের উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে।
মিরসরাইয়ের খামারি আজগর আলী বলেন, আগে যে খরচে একটি পশু হৃষ্টপুষ্ট করা যেত, এখন তা আর সম্ভব হচ্ছে না। একজন শ্রমিকের পেছনে মাসে ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ায় পরিবহন খরচও বেড়েছে, যার প্রভাব পড়ছে স্থানীয় খামারিদের ওপর।
চট্টগ্রাম জেলায় বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ১৪ হাজার ২৫৮টি নিবন্ধিত খামার রয়েছে। মিরসরাই, পটিয়া, সীতাকুণ্ড, ফটিকছড়ি, হাটহাজারী, আনোয়ারা ও বাঁশখালী উপজেলায় সবচেয়ে বেশি পশু উৎপাদন হয়। খামারিরা মনে করছেন, গোখাদ্যের বাজারে সরকারি তদারকি এবং সহজ শর্তে ঋণ ও প্রণোদনা দিলে এই খাতকে আবারও চাঙ্গা করা সম্ভব।
উৎপাদন কমলেও বড় ধরনের সংকটের সম্ভাবনা নেই বলে আশ্বস্ত করেছেন জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আলমগীর। তিনি বলেন, প্রতি বছরই চট্টগ্রামের স্থানীয় ঘাটতি মেটাতে উত্তরাঞ্চল, কুষ্টিয়া ও পার্বত্য এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ পশু আসে। এবারও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পর্যাপ্ত পশু সরবরাহের মাধ্যমে চাহিদা পূরণ হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ভারত থেকে পশু আমদানির বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. মো. আলমগীর জানান, দেশের বাইরে থেকে পশু আনার কোনো প্রয়োজন নেই। দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন দিয়েই চাহিদা মেটানো সম্ভব। বিদেশ থেকে পশু আনার কোনো অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না বলেও জানান তিনি। তবে গরু চোরাচালান ঠেকানোর দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বলেও মন্তব্য করেন এই কর্মকর্তা।


