গোয়েন্দা ব্যর্থতায় ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়েছিল। দেশের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার সাথে জড়িত একাধিক সূত্র থেকে একথা নিশ্চিত হয়েছে টাইমস অব বাংলাদেশ।
বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থায় কর্মরত কর্মকর্তারা জানান, সরকার পতনের বেশ আগেই তাদের কাছে ইঙ্গিত ছিল যে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন এই আন্দোলন শুধুমাত্র কোটা সংস্কারের দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং এটি ক্রমান্বয়ে সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নিচ্ছে।
তারা আরও জানান, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন ছিল বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন একটি গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হচ্ছে। কিন্তু এই উদ্বেগের কথা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কখনোই জানানো হয়নি।
একজন কর্মকর্তা জানান, তাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা শেখ হাসিনাকে এই বলে বিভ্রান্ত করেছিলেন যে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তার চিন্তার কোনো কারণ নেই।
কয়েকজন পর্যবেক্ষক এই পরিস্থিতিকে ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের স্থপতি ও প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবকে তার পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যসহ হত্যার সঙ্গে তুলনা করেন। এই পর্যবেক্ষকদের মতে, সে সময়েও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে আগাম তথ্য ছিল। কিন্তু তারা দেশের শীর্ষ নেতৃত্বকে যথাযথভাবে সতর্ক করতে পারেনি।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করার দাবি নিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়। মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে রংপুরে পুলিশের গুলিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ নিহত হওয়ার পর উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করে। একইভাবে ঢাকাতেও আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা নিহত হন।
পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় যখন আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে হামলা চালায় এবং আন্দোলনকারীদের ওপর নির্যাতন করে।
পুলিশ সূত্রের খবর অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা ধীরে ধীরে বুঝতে পারছিলেন যে আন্দোলনটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এবং এটি সরকারের জন্য একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
ডিএমপি কমিশনারের ভূমিকা:
এ বিষয়ের সাথে পরিচিত একাধিক ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ১৮ জুলাই ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার হাবিবুর রহমান তৎকালীন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের সাথে দেখা করেন। তিনি আইজিপিকে সতর্ক করে বলেন, বিক্ষোভ দ্রুত বাড়ছে এবং এটি একটি গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিতে পারে।
কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, হাবিবুর রহমান বলেছিলেন দেশি-বিদেশি বিভিন্ন পক্ষ সরকারকে অস্থিতিশীল করতে এই অশান্ত পরিস্থিতিকে কাজে লাগাচ্ছে। তিনি বিষয়টি সরাসরি শেখ হাসিনার নজরে আনার অনুরোধ জানান।
সূত্র জানায়, আইজিপি তাকে এই বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে আলোচনা করার পরামর্শ দেন। পরবর্তীতে হাবিবুর রহমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে দেখা করলেও তার কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে।
একটি সূত্রের দাবি, “স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই উদ্বেগকে উড়িয়ে দেন এবং উপহাস করে বলেন, কমিশনার অতিরিক্ত আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ডিএমপি কমিশনারের এ আলোচনার সময় সেখানে পুলিশের তৎকালীন স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) প্রধান মনিরুল ইসলাম এবং ডিটেক্টিভ ব্রাঞ্চ (ডিবি) প্রধান হারুন অর রশীদও উপস্থিত ছিলেন।
পুলিশ সদর দপ্তরে ফিরে হাবিবুর রহমান জানতে পারেন, আইজিপি ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে কথা বলেছেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে তাকে আশ্বস্ত করেছেন।
সূত্রটি দাবি করে, ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান যখন আইজিপিকে প্রশ্ন করেন কেন তার উদ্বেগের বিষয়টি জানানো হয়নি, তখন আইজিপি উত্তর দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী পুলিশ বাহিনীর জন্য অনেক কিছু করেছেন। এজন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীকে কোনো নেতিবাচক খবর দিতে চান না।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং আরও অনেকের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় আইজিপি মামুন নিজে ‘রাজসাক্ষী’ হওয়ার পর, অনেক কর্মকর্তা সেই সময়ে মামুনের ভূমিকা এবং সরকারবিরোধী শক্তির সাথে তার কথিত যোগাযোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সেই মামলায় হাসিনা ও কামাল উভয়েরই মৃত্যুদণ্ড হয়, অন্যদিকে আইজিপি মামুন সামান্য শাস্তি পান।
সাবেক আইজিপি আশরাফুল হুদা ‘টাইমস’কে বলেন, “আইজিপির মতো একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা কেন রাজসাক্ষী হলেন তা একটি রহস্য। এটি বিতর্কের সৃষ্টি করে এবং বিচার ব্যবস্থার জন্য একটি খারাপ নজির স্থাপন করে।”
গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নীরবতা:
জুলাই মাসে কারফিউ জারি এবং বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার জন্য সেনাবাহিনী মোতায়েনের পর, অবনতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়।
সূত্র অনুসারে, তৎকালীন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) মহাপরিচালককে শেখ হাসিনার নিরাপত্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি ঢাকা ডিটাচমেন্ট কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মিজানুর রহমানকে অপারেশনাল দায়িত্ব অর্পণ করেন।
তবে পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা পরিকল্পনার বিষয়ে সেনাবাহিনী এবং পুলিশের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়।
সূত্রগুলো জানায়, ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট সেনা সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত দরবারে সভাপতিত্ব করছিলেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। ওই বৈঠকে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ছাত্র আন্দোলনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানান।
দরবারে অংশগ্রহণকারীর কয়েকজন জানান, সেনাপ্রধান জবাবে বলেছিলেন সশস্ত্র বাহিনী সমাজেরই অংশ এবং তাদের কোনো রাজনৈতিক হাতিয়ার হওয়া উচিত নয়। তিনি সামরিক বাহিনীর সাংবিধানিক দায়িত্ব এবং বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষা করার কর্তব্যের ওপর জোর দিয়েছিলেন বলে জানান দরবারে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা।
একাধিক সূত্র অভিযোগ করেন, তৎকালীন ডিজিএফআই এবং জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা (এনএসআই) প্রধানরা ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীকে সরকারবিরোধী মনোভাবের তীব্রতা সম্পর্কে পর্যাপ্তভাবে সতর্ক করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।
কয়েকজন কর্মকর্তা টাইমস’কে বলেন, সশস্ত্র বাহিনীর কিছু অংশের মধ্যে বিভেদ তৈরি হওয়ার বিষয়ে ডিজিএফআই প্রধানমন্ত্রী হাসিনাকে সতর্ক করতে ব্যর্থ হয়েছিল। অন্যদিকে এনএসআই সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারেনি যে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনটি একটি গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিতে পারে।
কিছু কর্মকর্তা সাবেক ডিজিএফআই প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) সাইফুল আবেদীনের দেশে ফেরার দিকেও ইঙ্গিত করেছেন। তিনি অবসর গ্রহণের পর পরিবারের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছিলেন, কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই মাসে দেশে ফিরে আসেন। অভিযোগ রয়েছে, শেখ হাসিনার অধীনে দায়িত্ব পালন করা সাইফুল আবেদীন ঢাকায় অবস্থানকালে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার সাথে দেখা করেন এবং সরকারের বিরুদ্ধে কাজ করেন। শেখ হাসিনার পতনের পরপরই তিনি আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যান।
কোনো কোনো কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, তৎকালীন ডিজিএফআই প্রধানের একটি ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলের সাথে যোগাযোগ ছিল, যারা সরকারবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা পালন করেছিল। তবে এই অভিযোগ যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনিরুজ্জামান ‘টাইমস’কে বলেন, “যারা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোতে কাজ করতেন তারা ফ্যাসিবাদী শাসনের অংশ ছিলেন এবং হাসিনাকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছিলেন। তাদের অনেকেই দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন এবং তাদের পেশাদারিত্ব হারিয়েছিলেন।”
রাজনৈতিক ভুল হিসাব-নিকাশ:
সূত্রের খবর অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ ৪ আগস্ট দেশব্যাপী সমাবেশ করার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু একটি গোয়েন্দা সংস্থার সুপারিশের পর তা বাতিল করা হয়।
সমালোচকরা মনে করেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে পুলিশ এবং আন্দোলনকারীদের মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষের পথ তৈরি হয়। হতাহতের সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে রাজনৈতিক সংকট আরও ঘনীভূত হয়, যার চূড়ান্ত পরিণতিতে সরকারের পতন ঘটে এবং ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান।
অন্তত তিনজন কর্মকর্তা জানান, এসবির নিয়মিত প্রতিবেদনে জুলাই মাসজুড়ে একটি গণআন্দোলনের সম্ভাবনার বিষয়ে বারবার সতর্ক করা হয়েছিল। তবে, সরকার নিজেই পড়ে যেতে পারে—এমন কোনো সুনির্দিষ্ট মূল্যায়ন বা পূর্বাভাস সেখানে ছিল না।
সাবেক আইজিপি নুরুল হুদা টাইমস’কে বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে গোয়েন্দা ব্যর্থতার বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, “বিশ্বের যেকোনো স্থানে যখন কোনো সরকারের পতন ঘটে, তখন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কোথায় ব্যর্থ হয়েছিল তা নির্ধারণ করার জন্য তদন্ত করা হয়।”
তিনি মনে করেন, “হয়তো সংস্থাগুলো পরিস্থিতি পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারেনি।”
নুরুল হুদা বলেন: “তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার রাজনৈতিকভাবে বেশ প্রভাবশালী ছিলেন এবং সম্ভবত তার কাছে আগাম তথ্য ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা কোনো কাজে আসেনি।”


