গৃহকর্ত্রীকে মা ডেকেও মন পায়নি মোহনা, খুন্তি গরম করে শরীরে ছ্যাঁকা দেওয়া হতো

গৃহকর্ত্রীকে মা ডেকেও মন পায়নি মোহনা, খুন্তি গরম করে শরীরে ছ্যাঁকা দেওয়া হতো
চিকিৎসাধীন রয়েছেন মোহনা। বুধবার দুপুরে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে | ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

গৃহকর্ত্রী বিথীকে মা বলে ডাকত ১১ বছরের মা-হারা শিশু মোহনা। মা ডেকেও তার মন পায়নি সে। দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশরুমে আটকে রেখে রুটিনমাফিক পাশবিক নির্যাতন করা হতো বলে অভিযোগ করেছে ভুক্তভোগী শিশুটি।

চিকিৎসক জানিয়েছেন, শিশুটির শরীরের আঘাতগুলো দীর্ঘমেয়াদি এবং ধারাবাহিকভাবে দেওয়া হয়েছে। মোহনার শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। সময়ভেদে এসব আঘাতের চিহ্ন ১০ দিন, ১৫ দিন, ২০ দিন আগের। কোনো কোনো আঘাত এক মাস বা দুই মাস আগের। ভালো কোনো খাবারও খেতে দেওয়া হয়নি শিশুটিকে।

ভুক্তভোগী শিশুটি জানিয়েছে, ‘মার (গৃহকর্ত্রী বিথী) সঙ্গে নারী বুয়া ও কাজের ছেলে আমাকে অনেক মারধর করত। তারা মারধর করলে মা তাদের কিছু বলত না।’

মারধরের বিষয়ে জানতে চাইলে মোহনা বলে, ‘মা আমাকে নির্যাতন করেছে। যখন-তখন মারধর করত। খুন্তি গরম করে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ছ্যাঁকা দিত। মাথার চুল টেনে লাঠি দিয়ে পেটাত। কখনো স্যারের (গৃহকর্তা) কাছে যেতে দিত না। সবসময় বাথরুমে আটকে রাখত। খেতে দিত না। পেটে খিদা লাগলেও আমি ভয়ে খাবার চাইতাম না।’

তোমাকে মারধর করার সময় স্যার (গৃহকর্তা) কোথায় ছিলেন–এ প্রশ্নে শিশুটি জানিয়েছে, ‘স্যারের সামনে আমাকে কখনো যেতে দিত না। আমাকে মারধর করলে স্যার জানত না। স্যার বাসায় আসলে আমাকে বাথরুমে আটকে রাখত। স্যার আমাকে কখনো মারেনি। স্যারের কোনো দোষ নেই।’

সে আরও বলে, ‘আমি একটু একটু কাজ করতাম, বাসায় বাবুকে দেখতাম। তরকারি কেটেকুটে দিতাম, ঘর মুছতাম। বাবু দেখি না, কাজ করি না কেন–এজন্য আমাকে গরম খুন্তি দিয়া ছ্যাঁকা দিত, লাঠি দিয়া মারত। সারা শরীরে এ রকম মারছে।’

বুধবার দুপুরে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের ১৫ নম্বর কক্ষে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মোহনা এসব কথা বলে।

মোহনা পঞ্চগড় জেলা সদর উপজেলার ফকিরপাড়া গ্রামের হোটেল শ্রমিক গোলাম মোস্তফার মেয়ে। সে তার বাবার সঙ্গে গাজীপুর মহানগরীর কোনাবাড়ী থানার কুদ্দুস নগরের পেয়ারা বাগান এলাকায় বসবাস করত। গোলাম মোস্তফা কোনাবাড়ী এলাকায় একটি হোটেলে কাজ করেন।

মোহনার বয়স যখন তিন বছর, তখন গাইবান্ধার পলাশবাড়ী এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় তার মা নিহত হন। এরপর কয়েক বছর সে দাদির সঙ্গে থাকত।

মোহনার বাবা গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘গত বছরের কোরবানির ঈদের পর আমি উত্তরা একটি দোকানে বসে চা খাচ্ছিলাম। ওই চা দোকানের সামনে উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরের একটি বাড়ির সিকিউরিটি গার্ড জাহাঙ্গীর কথায় কথায় বলছিল, বিমান কর্মকর্তা স্যারের বাসায় একটা কাজের মেয়ে লাগবে। তখন আমি বলি, আমার মেয়ে আছে। গার্ড বলে নিয়ে আসেন, ম্যাডাম খুব ভালো মানুষ।’

আরও পড়ুন

তিনি বলেন, ‘যেদিন মেয়ে নিয়ে যাই, বাসায় উঠে দেখি টেবিলে খাবারের অভাব নাই। ম্যাডাম আমাকে বলে, কী হিসেবে তোমার মেয়েকে দেবে? কন্টাক্টে দেবে? আমি বলি এভাবে দেব না। মেয়ের ভবিষ্যতের জন্য আপনার কাছে রেখে যাব। তিনি রাজি হলে মেয়েকে রেখে যাই। প্রায় আট মাস ম্যাডামের বাসায় ছিল।’

গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘৩০ জানুয়ারি ম্যাডাম ফোন দেয়, মেয়েকে এসে নিয়ে যাও। ৩১ জানুয়ারি আমার মাকে সঙ্গে নিয়ে উত্তরায় আসি। ম্যাডাম বাসায় ছিল না। বিকালে এসে একটা সাদা কাগজ নিয়ে নিচে নামে। আমাকে সাদা কাগজে সই দিতে বলে।’

তিনি বলেন, ‘সই করার পর মেয়েকে এনে দেয়। মোহনাকে দেখে বলি, ম্যাডাম এ রকম হলো কেন? আমি তো এমন দিইনি। ম্যাডাম বলে, বাথরুমে পড়ে চুলকানি হয়েছে।’

মোহনার বাবা আরও বলেন, ‘ম্যাডাম বলল, কবিরাজ দেখাতে। আরও বলল, তোমার মেয়ের মাথায় সমস্যা আছে।’

তিনি অভিযোগ করেন, ‘আট মাসে আমি কোনো দিন স্যারের সঙ্গে দেখা করতে পারিনি। শুধু ম্যাডাম আর কাজের বুয়ার সঙ্গে দেখা করেছি। প্রথম দিন ছাড়া কোনো দিন বাসায় ঢুকতে দেয়নি।’

তিনি বলেন, ‘উত্তরা থেকে বাসায় ফেরার পথে আমার মেয়ে শুধু বলছে, আব্বা আমি খাব, খাব। তারা খাবার দিত না, খালি মারত মেয়েটাকে। সবসময় বাথরুমে রেখে দিত, রাতেও।’

গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘আমি গরিব মানুষ। মেয়েকে পালতে পারব না দেখে বড় লোকের বাসায় দিয়েছিলাম। তারা বলেছিল, মেয়েকে লালন-পালন করে বিয়ে দেবে। এখন দেখি আর কয়েক দিন থাকলে মেয়েটা মারা যেত।’

তিনি বলেন, ‘আমি চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছি। আমি সবার শাস্তি চাই এবং গৃহকর্ত্রীর ফাঁসি চাই।’

মোহনার দাদি রেজিয়া (৭০) বলেন, ‘ওই নারী মানুষকে মানুষ মনে করে না। খুন্তি গরম করে মেয়েটাকে মারত। পেছনে লাঠি দিয়ে বাইড়িয়ে ফাটিয়ে ফেলেছে।’

তিনি বলেন, ‘শেষ তিন মাস আমাদের দেখা করতে দেয়নি। গেটে দারোয়ান ধাক্কা দিয়ে বের করে দিত।’

তিনি আরও বলেন, ‘সাদা কাগজে সই করিয়ে বলেছে, কোনো দাবি নেই। পরে পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছে।’

মোহনাকে আট বছর লালন-পালন করা ইসরাফিল বলেন, ‘আমি মোহনাকে লালন পালন করেছি আট বছর। পরে তার বাবা বলে বড়লোক মানুষের কাছে দেবে। এখন শুনলাম অত্যাচার করেছে। আমি চাই, তাদের বিচার হোক; ভবিষ্যতে যেন কেউ গরিব বাচ্চার সঙ্গে এমন না করে।’

গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান চিকিৎসক মোহাম্মদ খলিলুর রহমান বলেন, ‘মোহনার শরীরের আঘাতগুলো দীর্ঘমেয়াদি। রুটিনমাফিক হাতে, পায়ে, পিঠে আঘাত করা হয়েছে।

মেয়েকে নির্যাতনের অভিযোগ এনে গত রোববার উত্তরা পশ্চিম থানায় শিশু নির্যাতনের অভিযোগে একটি মামলা করেন মোহনার বাবা। ওই দিন রাত সাড়ে ৩টার দিকে ঢাকার উত্তরা থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সাফিকুর রহমান এবং তার স্ত্রী বিথীসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তার অন্য দুজন হলেন শফিকুর রহমানের বাসার গৃহকর্মী রুপালী খাতুন এবং সুফিয়া বেগম। পরদিন সোমবার বিকালে তাদের আদালতে পাঠানো হয়। ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি কাজী রফিক আহমেদ বলেন, ‘শিশু গৃহকর্মী নির্যাতনের মামলায় সাফিকুর রহমান এবং তার স্ত্রী বিথীসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হলে সেখান থেকে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad