ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলের বিমান হামলায় সশস্ত্র সংগঠন হামাসের শীর্ষ আলোচক খলিল আল-হাইয়ার ছেলে আজ্জাম আল-হাইয়া গুরুতর আহত হয়েছেন। বুধবার গাজা উপত্যকার বিভিন্ন স্থানে চালানো ওই হামলায় নিহত হয়েছেন অন্তত পাঁচজন।
চিকিৎসক ও হামাস সূত্রের বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, গাজা সিটিতে চালানো একটি হামলায় আজ্জাম আল-হাইয়া আহত হন। ওই হামলায় আরও একজন নিহত হয়েছেন।
তার বাবা খলিল আল-হাইয়া গাজায় হামাস শাখার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং তিনি দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের সঙ্গে গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে পরোক্ষ আলোচনায় নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। অবশ্য খলিল আল-হাইয়া অনেক বছর ধরে নির্বাসিত আছেন।
তবে তার পরিবারের ওপর হামলা এই প্রথম নয়। এর আগেও তিনি নিজের পরিবারের সদস্যদের হারিয়েছেন। ২০০৮ ও ২০১৪ সালের সংঘাতে ইসরায়েলের হামলায় তার দুই ছেলে নিহত হন। এ ছাড়া গত বছর দোহায় হামাস নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে চালানো এক ইসরায়েলি অভিযানে তার আরেক ছেলে নিহত হন।
হামাসের কর্মকর্তা ও খলিল আল-হাইয়ার সহযোগী তাহের আল-নোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, ‘আজ্জাম খলিল আল-হাইয়াকে লক্ষ্য করে গোলাবর্ষণ নৈতিক ও মানবিক অবক্ষয়ের চরম উদাহরণ। যুদ্ধবিরতিতেও এসব হামলা ও হত্যাকাণ্ড আমাদের অবস্থানকে আরও দৃঢ় করে এবং আমরা নিজেদের জনগণের অধিকার ও স্বাধীন ইচ্ছার পক্ষে আরও অনড় হয়ে যাই।’
এ ঘটনায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনী তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। তবে একই দিনে আরও দুটি ইসরায়েলি বিমান হামলায় চার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা। নিহতদের মধ্যে হামাস-নিয়ন্ত্রিত পুলিশ বাহিনীর এক কর্নেলও রয়েছেন।
চিকিৎসকরা জানান, দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে মাদকবিরোধী বাহিনীর প্রধান নাসিম আল-কালাজানিকে বহনকারী গাড়িতে হামলা চালানো হয়। আল-মাওয়াসি এলাকার কাছে ওই হামলায় তিনি নিহত হন। এতে আরও অন্তত ১৭ জন আহত হয়েছেন।
এর আগে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, গাজায় হামাস-নিয়ন্ত্রিত পুলিশ বাহিনীর ওপর ইসরায়েল হামলা জোরদার করেছে। ওই বাহিনীকে হামাস গাজার নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে নিজেদের প্রভাব বজায় রাখতে ব্যবহার করে আসছে।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী আল-মাওয়াসি এলাকায় হামলার কথা নিশ্চিত করেছে। তাদের দাবি, হামাসের এক সদস্যকে লক্ষ্য করে ওই হামলা চালানো হয়েছে। তবে অন্য হামলাগুলো সম্পর্কে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি তারা।
এদিকে চলমান সহিংসতার মধ্যেই হামাস ও অন্য ফিলিস্তিনি সংগঠনের নেতারা এই সপ্তাহে কায়রোয় মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেখানে শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী বোর্ডের প্রধান দূত নিকোলাই ম্লাদেনভও উপস্থিত ছিলেন। কর্মকর্তারা জানান, বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
গত অক্টোবরে ইসরায়েল ও হামাস মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রস্তাবিত ‘গাজা শান্তি পরিকল্পনায়’ সম্মত হয়েছিল। ওই পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইসরায়েলি সেনারা গাজা থেকে সরে যাবে, পুনর্গঠন কাজ শুরু হবে এবং হামাস অস্ত্র সমর্পণ করবে।
তবে হামাসের নিরস্ত্রীকরণই এখন শান্তি আলোচনার সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে গত অক্টোবরে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার প্রচেষ্টাও জটিল হয়ে পড়েছে।
ইসরায়েল ও হামাস উভয় পক্ষই গাজায় চলমান সহিংসতার জন্য একে অপরকে দায়ী করছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার বড় অংশ এখনও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে আছে।
হামাসের এক কর্মকর্তা বুধবার রয়টার্সকে বলেন, প্রথম ধাপের চুক্তির আওতায় ইসরায়েলের বাকি প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত দ্বিতীয় ধাপের আলোচনা নিয়ে তারা কোনো গুরুতর সংলাপে যাবে না বলে নিকোলাই ম্লাদেনভকে জানানো হয়েছে।
স্থানীয় চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৮৩০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে ইসরায়েলের দাবি, একই সময়ে ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের হামলায় তাদের চার সেনা নিহত হয়েছে।
গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৭২ হাজার ৫০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের অধিকাংশই বেসামরিক মানুষ।


