গাজার একটি অস্থায়ী তাঁবুর ভেতরে বসে ৪৬ বছর বয়সী রাবাব দেইফাল্লাহকে হাতে থাকা পুরোনো একটি লাইটারে বারবার চাপ দিতে দেখা গেল। পাঁচ সন্তানের এই জননী কাঠে আগুন ধরানোর চেষ্টা করছেন। এই পুরোনো লাইটারটি এখন গাজায় তার জীবনধারণের অন্যতম প্রধান অবলম্বন।
২০২৩ সালে ইসরায়েলি হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে গাজা উপত্যকার বাসিন্দাদের জন্য একটি নতুন লাইটার কেনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে নিজের পুরোনো লাইটারটি ছেলের হাত দিয়ে বারবার মেরামত করিয়ে নিচ্ছেন রাবাব। গ্যাসের তীব্র সংকট ও জ্বালানির আকাশচুম্বী দামের কারণে তার কাছে এখন রান্নার লাকড়ি দৈনন্দিন জীবনের একমাত্র ভরসা। এই লাকড়ি জ্বালিয়ে তিনি সন্তানদের জন্য রুটি তৈরি করেন কিংবা পানি গরম করেন।
আল জাজিরাকে রাবাব বলেন, ‘খাবার খেয়ে টিকে থাকাটা এখন পুরোপুরি আগুনের ওপর নির্ভরশীল। আর সেই আগুন জ্বালানোর প্রথম ধাপ হলো একটা লাইটার। অথচ এটিই এখন গাজার সবচেয়ে দুষ্প্রাপ্য জিনিসের একটি।’
যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বাজারে লাইটার অত্যন্ত সহজলভ্য ছিল। তখন মাত্র এক শেকেল (প্রায় ৪০ টাকা) দিয়ে রাবাব এক সঙ্গে তিনটি লাইটার কিনতে পারতেন। অথচ বর্তমানে একটি নতুন লাইটার কিনতে গুণতে হচ্ছে ২৭ থেকে ৩৩ ডলার (প্রায় ৩ হাজার ৩১০ থেকে ৪ হাজার ৪০ টাকা)। এমনকি নিজের পুরোনো লাইটারটি মেরামত করাতে রাবাবের খরচ হয়েছিল ১২ ডলার (প্রায় ১ হাজার ৪৭১ টাকা)।
ক্ষোভ প্রকাশ করে রাবাব প্রশ্ন করেন, ‘আমি এই টাকায় লাইটার কিনব, নাকি সন্তানদের জন্য ময়দা কিনব?’
গাজার ফিলিস্তিনিরা বর্তমানে নিজেদের সীমিত সম্বল দিয়ে কেবল খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খাচ্ছেন। ফলে একটি মাত্র লাইটার দিয়ে কয়েকটি তাঁবুর পরিবারকে ঘুরে-ফিরে কাজ চালাতে হচ্ছে। আগুন জ্বালাতে না পারলে পরিবারগুলোকে পোহাতে হয় চরম দুর্ভোগ–হয় ঠান্ডা খাবার খেতে হয়, না হয় প্রতিবেশীদের কাছে গিয়ে ধার পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয়।
অনেক সময় রাবাব তার সন্তানদের হাতে কাঠের টুকরো দিয়ে প্রতিবেশীর জ্বলন্ত চুলা থেকে আগুন এনে রান্নার ব্যবস্থা করেন। কখনো বা প্রতিবেশীর চুলাতে খাবার গরম করে দেওয়ার অনুনয় করেন। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, নিজের কাছে থাকা জীর্ণ লাইটারটিকে পরম যত্নে আগলে রাখেন তিনি।
আগুনের জন্য প্রতিদিনের সংগ্রাম
রাবাবের তাঁবুর অদূরে একই মানবিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন ৪৩ বছর বয়সী হাসনা মনসুর। তবে তার সংগ্রামের রূপটি আরও একটু ভিন্ন।
জাবালিয়া শরণার্থী শিবির থেকে বাস্তুচ্যুত হওয়া হাসনা এখন মাটির একটি চুলার পাশে বসে কাজ করেন। ছয় সন্তানের ভরণপোষণের খরচ চালাতে তিনি নিজে রুটি বানিয়ে তা বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছেন।
নতুন লাইটার কেনার সামর্থ্য না থাকায় হাসনাও তার পুরোনো লাইটারটি বারবার মেরামত করে ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন। লাইটারটি পুরোপুরি অচল হয়ে পড়লে আগুন খোঁজার জন্য তিনি মেয়েকে বাইরে পাঠান। এমন দিনও গেছে, কেবল আগুনের ব্যবস্থা করতেই বেলা ১০টা বেজে পার হয়ে গেছে।
অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞায় মানবসৃষ্ট সংকট
গাজায় ইসরায়েলের অব্যাহত সামরিক অবরোধের কারণেই মূলত লাইটার ও সমজাতীয় পণ্যের এই চরম সংকট দেখা দিয়েছে। জাতিসংঘের মানবিক সমন্বয় সংস্থা (ওসিএইচএ) জানিয়েছে, সীমান্ত ক্রসিংগুলো বন্ধ থাকা এবং পরিবহনের ওপর নানা কড়াকড়ির কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছে, যার ফলে দামও বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে।
ওসিএইচএ আরও উল্লেখ করে, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ যেসব পণ্যকে ‘দ্বিমুখী ব্যবহারযোগ্য’ (অর্থাৎ সামরিক ও বেসামরিক উভয় ক্ষেত্রে ব্যবহার করা সম্ভব) হিসেবে চিহ্নিত করেছে, সেগুলোর গাজায় প্রবেশের অনুমোদন মেলা অত্যন্ত দুষ্কর।
গত জুনে গাজা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি এক বিবৃতিতে জানায়, সীমান্ত পয়েন্টগুলোতে কঠোর বিধিনিষেধ এবং বাণিজ্যিক আমদানির জটিল প্রক্রিয়ার কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের স্বাভাবিক সরবরাহ মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়েছে।


