জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সেই দিনগুলোতে আন্দোলন দমাতে এক পর্যায়ে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রেখেছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। কীভাবে ইন্টারনেট বন্ধ হয়েছিল তা নিয়ে ভেতরকার তথ্য এতদিন জানা যায়নি।
তখনকার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলকের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আদালতে জবানবন্দিতে উঠে এসেছে সেই তথ্য।
মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর শুনানিতে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেডের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মির্জা কামাল আহমেদের আদ্যোপান্ত জানিয়েছেন।
এ মামলায় পলক ছাড়াও আসামি রয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়। পলাতক থাকায় তার হয়ে আইনি লড়াই করছেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মনজুর আলম।
মির্জা কামাল আহমেদ বলেন, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই সন্ধ্যা সাতটার পরে বিটিআরসি কর্তৃক ‘১৮তম জুলাই আইসিটি অপারেশনস’ নামে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খোলা হয়। সেখানে বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানির প্রতিনিধি ডিজিএম আব্দুল ওয়াহাবকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সরকারি কোম্পানি হিসেবে সাবমেরিন ক্যাবলের পাশাপাশি বিটিসিএলের একজন প্রতিনিধি আনোয়ার হোসেন মাসুদকেও রাখা হয়।
সেই গ্রুপে রাত পৌনে আটটার দিকে বিটিআরসির তৎকালীন ডিজি কাজী মোস্তাফিজুর রহমান একটি ভয়েস কলের মাধ্যমে ইন্টারনেট শাটডাউনের সরকারি সিদ্ধান্ত জানিয়ে নির্দেশনা দেন। সাবমেরিন ক্যাবলের প্রতিনিধি আব্দুল ওয়াহাব তাকে বিষয়টি ফোনে জানান। এ ছাড়া বিটিআরসি কর্তৃক আগেই ‘আইআইজি অপারেশনস’ নামে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ চালু ছিল, সেখানে বিটিআরসির উপপরিচালক মেহেরীন আহসান একটি এসএমএসের মাধ্যমে সকলকেই ইন্টারনেট বন্ধ করে ‘ডান’ লিখে জানানোর নির্দেশনা দেন।
সাক্ষী উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানির প্রধান কার্যক্রম সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া হয়। এ ছাড়া আইআইজি লেভেলে গ্রাহক সেবা প্রদানের লাইসেন্স রয়েছে। আমি সাবমেরিন এবং আইআইজি দুস্তরেই ইন্টারনেট বন্ধের বিষয়ে জেনে অনেকটা অবাক হই।
সাক্ষী আরও জানান, তিনি আব্দুল ওয়াহাবকে শুধু আইআইজি লেভেলে ইন্টারনেট বন্ধের ক্ষেত্রে সম্মতি দিই। সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানির আইআইজি স্তরে গ্রাহক সংযোগ ক্যাপাসিটি ছিল প্রায় ২০০ জিবিপিএস। ওই সময় সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানির মোট গ্রাহক সংযোগ ছিল প্রায় ২ হাজার ৭০০ জিবিপিএস, যা তখন দেশের মোট সংযোগের ৪০ শতাংশ।
সাক্ষীর দাবি, ১৮ জুলাই রাত আটটার দিকে আব্দুল ওয়াহাব আমাকে মোবাইলে কল করে জানান, বিটিআরসি সাবমেরিন ক্যাবল লেভেলে কক্সবাজার এবং কুয়াকাটায় সাবমেরিন ব্যান্ডউইথ শাটডাউনের নির্দেশনা দিয়েছেন। ইতিপূর্বে আমার জানামতে সাবমেরিন লেভেলে কখনো ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়নি বলে নির্দেশনাটি শুনে তিনি অবাক হন।
একই তারিখে রাত পৌনে আটটার দিকে বিটিআরসির ডিজি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কাজী মোস্তাফিজুর রহমান তাকে মোবাইলে কল করেন এবং সাবমেরিন লেভেলে ইন্টারনেট বন্ধ করার নির্দেশনা দেন। কিছু সময় পরে আব্দুল ওয়াহাব জানান, সকল আইটিসি অপারেটর এবং আইআইজি অপারেটর তাদের ব্যন্ডউইথ শাটডাউন করেছে। আমি তখন বিটিসিএলে কথা বলি। জানা যায়, বিটিসিএলও তাদের আইটিসি এবং আইআইজি ব্যান্ডউইথ শাটডাউন করেছে।
তখন শুধুমাত্র সাবমেরিন ক্যাবলের ব্যান্ডউইথ চালু ছিল এবং আইআইজি অপারেশনস গ্রুপে সাবমেরিনের ব্যান্ডউইথ বন্ধ না করার বিষয়ে বিভিন্ন অপারেটর কমেন্ট করছিলেন।
সেদিন রাত নয়টার দিকে তৎকালীন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক আমাকে ফোন করেন এবং বিটিআরসির নির্দেশনা কেন প্রতিপালন করছি না তা জানতে চান।
এ ছাড়া তিনি সাবমেরিন লেভেলে ইন্টারনেট বন্ধ করতে কত সময় লাগতে পারে তা জিজ্ঞেস করেন। জবাবে আমি বলি, আনুমানিক ১৫ মিনিট লাগবে। তিনি আমাকে ইন্টারনেট বন্ধ করে কনফার্ম করতে বলেন। অতঃপর আমি তার অধীনস্ত জেনারেল ম্যানেজার অপারেশনসের মাধ্যমে কক্সবাজার এবং কুয়াকাটায় সাবমেরিন ক্যাবল দুটো শাটডাউন করতে সরকারের সিদ্ধান্ত জানাই এবং ১৫ মিনিটের মধ্যেই সাবমেরিন দুটো শাটডাউন করা হয়।
২০২৪ সালের ২৩ জুলাই বিটিআরসিতে সভা অনুষ্ঠিত হয় জানিয়ে সাক্ষী বলেন, সেখানে বিভিন্ন অপারেটর, বিটিসিএল, সাবমেরিন ক্যাবল, বিটিআরসি এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ, আইসিটি বিভাগসহ বিভিন্ন স্টেকহোল্ডার অংশগ্রহণ করেন।
সভা শেষে পলক সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে তিনি আশ্বস্ত করেন, ২৩ জুলাই রাতের মধ্যেই ইন্টারনেট চালু করার সম্ভাবনা আছে। সেই রাতে আমি সাবমেরিন ক্যাবল লেভেলে ইন্টারনেট চালু করতে বিটিআরসি থেকে নির্দেশনা পাই। এরপর রাত পৌনে নয়টার দিকে সাবমেরিনের ব্যান্ডউইথ চালু করা হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সকাল আনুমানিক দশটার সময় বিটিআরসির তৎকালীন ডিজি কাজী মোস্তাফিজুর রহমান আবার সাবমেরিন ব্যান্ডউইথ বন্ধের নির্দেশনা দেন। ওইদিন আনুমানিক সকাল ১১টার দিকে সাবমেরিন ব্যান্ডউইথ বন্ধের ব্যবস্থা করি। পরবর্তীতে আনুমানিক বেলা সোয়া একটার দিকে তিনি সাবমেরিন চালুর নির্দেশনা দেন। তারা তখনই সাবমেরিন ক্যাবল চালু করি।
মির্জা কামাল আহমেদ জানান, তিনি এই বক্তব্যের সমর্থনে নিজের মোবাইল নম্বরের এক মাসের সিডিআর এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট তদন্ত কর্মকর্তাকে সরবরাহ করেছেন। সিডিআরের ১৯ পৃষ্ঠা এবং ফরোয়ার্ডিং রিপোর্ট এক পৃষ্ঠা ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হয়েছে। এ ছাড়া তার বক্তব্যে ‘আইআই অপারেশনস’ নামে যে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের কথা এসেছে, সেই গ্রুপে যে কথোপকথন হয়েছে, তার সমর্থনে পাঁচ পৃষ্ঠা স্ক্রিনশট ট্রাইব্যুনালে দাখিল করেন।
এর আগে গত ১৬ এপ্রিল আরেকজন সাক্ষী জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে তৎকালীন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের নির্দেশে দেশে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করা হয়।
জবানবন্দিতে তিনি উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই সন্ধ্যা সাতটায় তাকে ফোন করেন বিটিআরসির তৎকালীন মহাপরিচালক কাজী মোস্তাফিজুর রহমান।


