চলমান ঋণ নবায়নের নিয়মে বড় ধরনের শিথিলতা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও ঋণটি খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকৃত হওয়ার আগ পর্যন্ত তা নবায়নের সুযোগ রেখে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধান ও নীতি বিভাগ এই সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে সব তফসিলি ব্যাংককে অবিলম্বে তা কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সুবিধা একদিকে চাপে থাকা ব্যবসা ও ব্যাংকগুলোর জন্য তাৎক্ষণিক স্বস্তি আনবে; অন্যদিকে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র আড়াল হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি করেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ‘নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা কারণে’ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নবায়ন সম্ভব না হলে, ঋণটি এনপিএল বা খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকৃত হওয়ার আগে পর্যন্ত নবায়ন করা যাবে । এ সুবিধা ৩১ ডিসেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত বহাল থাকবে।
চলমান বা কন্টিনিউয়াস ঋণ মূলত একটি ঘূর্ণায়মান ঋণসীমা, যা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে বারবার উত্তোলন ও পরিশোধ করা যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংজ্ঞা অনুযায়ী, নির্ধারিত সীমার মধ্যে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ব্যবহারযোগ্য এবং নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে নবায়নযোগ্য ক্রেডিট সুবিধাই চলমান ঋণ।
সাধারণত এটি এক বছর মেয়াদি হয় এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের দৈনন্দিন কার্যক্রম সচল রাখতে ব্যবহৃত হয়। ক্যাশ ক্রেডিট, ওভারড্রাফট, প্যাকিং ক্রেডিট বা এলসি সংশ্লিষ্ট স্বল্পমেয়াদি ট্রেড ফাইন্যান্স; এসবই চলমান ঋণের আওতায় পড়ে।
উদাহরণ হিসেবে, একটি আমদানি-রপ্তানি প্রতিষ্ঠানকে যদি পাঁচ কোটি টাকার চলমান ঋণসীমা দেওয়া হয়, তাহলে তারা প্রয়োজন অনুযায়ী ওই সীমার মধ্যে টাকা তুলতে ও পরিশোধ করতে পারে। তবে মেয়াদ শেষে নবায়ন না হলে ঋণটি মেয়াদোত্তীর্ণ বা ওভারডিউ হয়ে যায় এবং নির্দিষ্ট সময় পার হলে খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকৃত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
আগের নির্দেশনায় মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ পূর্ণ সমন্বয় ছাড়া নিয়মিত অবস্থায় ফেরানো যেত না।
নতুন সার্কুলারে সেই কঠোর অবস্থান থেকে সরে এসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, নবায়নের প্রক্রিয়া মেয়াদ শেষ হওয়ার কমপক্ষে দুই মাস আগে শুরু করতে হবে। তবুও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নবায়ন না হলে, খেলাপি হওয়ার আগ পর্যন্ত তা নবায়নের সুযোগ থাকবে, তবে দেরির কারণ লিখিতভাবে সংরক্ষণ করতে হবে ।
সার্কুলারে আরও স্পষ্ট করা হয়েছে, ঋণের সীমাতিরিক্ত অংশ থাকলে তা সমন্বয় করে নবায়ন করতে হবে । অতিরিক্ত অংশকে মূল ঋণ থেকে আলাদা করে নতুন ঋণ হিসেবে সৃষ্টি বা অন্য হিসাবে স্থানান্তর করা যাবে না।
ব্যাংকারদের মতে, আমদানি-রপ্তানি ও বাণিজ্য খাতের স্বল্পমেয়াদি ঋণ নবায়নে যে প্রক্রিয়াগত জটিলতা তৈরি হচ্ছিল, এই সিদ্ধান্ত তা কমাবে। বর্তমান অর্থনৈতিক চাপে অনেক ব্যবসা নির্ধারিত সময়ে পুরো সমন্বয় করতে না পারায় খেলাপি হয়ে যাচ্ছিল। নতুন নিয়ম সেই ঝুঁকি কমাবে।
তবে আর্থিক বিশ্লেষকদের একাংশ সতর্ক করছেন, এই শিথিলতা যদি কড়াভাবে তদারকি না করা হয়, তাহলে প্রকৃত দুর্বল ঋণও কাগজে নিয়মিত দেখানোর প্রবণতা বাড়তে পারে। অতীতে একাধিক দফা পুনঃতফসিল ও ছাড়ের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সাময়িক স্বস্তি দীর্ঘমেয়াদে ঋণ শৃঙ্খলা দুর্বল করেছে। খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র আড়াল হলে বাজার আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সার্কুলারে দেশের ‘সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট’ বিবেচনার কথা উল্লেখ করেছে । অর্থাৎ নীতিনির্ধারকরা ব্যবসা-বাণিজ্য সচল রাখতে নমনীয়তার পথ বেছে নিয়েছেন। কিন্তু একই সঙ্গে লিখিত কারণ সংরক্ষণ ও সীমাতিরিক্ত অংশ সমন্বয়ের শর্ত দেওয়া হয়েছে।


