জীবনে কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্য আনতে, পরিবারের সদস্যদের মুখে হাসি ফোটাতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমানে গিয়েছিলেন তারা। বিদেশ-বিভুঁইয়ে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতেন, যেন দেখা মেলে কাঙ্ক্ষিত ‘সুখপাখির’। আদৌ তারা সেই সুখের দেখা পেয়েছিলেন কিনা, তা আর কোনোদিন জানা যাবে না। আমরা এখন কেবল জানব তাদের পরিবারের দুঃখের কথা, প্রিয়জন হারানোর বেদনার কথা, স্বপ্নভঙ্গের কথা।
বলছি ওমানে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত আট প্রবাসী শ্রমিকের কথা। যাদের সাতজনের বাড়ি চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলায়, অন্যজনের রাউজানে।
গত ৮ অক্টোবর ওমানের ধুকুম প্রদেশের সিদরা এলাকায় এই প্রবাসী বাংলাদেশিদের বহনকারী গাড়ির সঙ্গে আরেকটি গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষ হলে ঘটনাস্থলেই তাদের মৃত্যু হয়।
শনিবার রাতে যখন পুড়ছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজ, তখন আটটি কফিন নিয়ে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইট। সেখান থেকে নিহতদের মরদেহ বুঝে নেন স্বজনরা।
রোববার সাগরপথে দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপে পৌঁছে কফিনগুলো। এই খবরে দ্বীপজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া।

আগে থেকেই ঘাটে অপেক্ষা করছিলেন স্বজন, বন্ধু, প্রতিবেশী। কেউ স্তব্ধ, কেউ নীরবে চেয়ে আছে নদীর দিকে। কারও বুক চিরে বের হচ্ছিল শুধুই হাহাকার।
মরদেহ সন্দ্বীপে পৌঁছার পর শুরু হয় গোসলসহ জানাজার প্রস্তুতি। বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে জানাজা ও দাফন সম্পন্ন করে পরিবারগুলো।
নিহত আমিন মাঝি, মো. আরজু, মো. রকি, সাহাব উদ্দিন, মো. বাবলু, মো. জুয়েল এবং মো. রনি ছিলেন তাদের পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। যাদের মৃত্যু পরিবারগুলোয় কেবল কষ্টই বয়ে আনেনি, নিয়ে এসেছে দুশ্চিন্তাও।
তবে সন্দ্বীপের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মংচিংনু মারমা বলেছেন, সরকারি সহায়তা পাবে সাত রেমিট্যান্স যোদ্ধা পরিবার। তিনি বলেন, ‘এ মৃত্যু পুরো দ্বীপকে কাঁদিয়েছে। সরকারিভাবে যা যা করার তা করা হবে। পরিবারগুলো প্রাপ্য সকল সহায়তা পাবে।’
সন্দ্বীপের এই সাত সন্তানই ওমানে সাগরে মাছ ধরার কাজে নিয়োজিত ছিলেন বলে জানা গেল পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলাপে।
রনির অসমাপ্ত ঋণ, অপূর্ণ স্বপ্ন
নিহতদের মধ্যে মোশাররফ হোসেন রনি ছিলেন সন্দ্বীপ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। সংসারের আর্থিক টানাটানি মেটাতে দুই বছর আগে পাড়ি জমান ওমানে। দেশে ছোট্ট চায়ের দোকান ছিল তার। কিন্তু আরেকটু ভালো থাকার আশায়, পরিবারে স্বচ্ছলতা আনতে, ছেলেকে ভালো স্কুলে পড়ানোর স্বপ্ন পূরণ করতে ঋণ করে চলে যান ওমান।
কিন্তু রনি ফিরেছেন কফিনবন্দী হয়ে। তার ঋণ কে শোধ করবে, কে তার সন্তানের পড়ালেখার স্বপ্ন পূরণ করবে তার সবকিছুই এখন অনিশ্চিত।
সন্তানকে দেখতেই পেলেন না রকি
সাত বছর ধরে ওমানে কাজ করতেন রকি। তার বাবা মো. ইব্রাহিম জানালেন, গত বছরই ছুটিতে দেশে এসেছিলেন রকি। এরপর ফিরে যান। চার মাস আগে তার একটি কন্যাসন্তান হয়েছে। সেই সন্তানের মুখ দেখার আগেই রকি চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

স্থায়ীভাবে ফিরলেন জুয়েল
জুয়েলের স্বপ্ন ছিল এরপর যখন দেশে ফিরবেন, একেবারে ফিরবেন। আর যাবেন না প্রবাসে। সেই স্বপ্ন তার পূরণ হয়েছে, তবে এবার ফিরতে হয়েছে নিথর দেহ নিয়ে।
তার বাবা মো. জামান বলেন, ‘ছেলেটা আট মাস আগে দেশে এসেছিল। বলেছিল এরপর স্থায়ীভাবে ফিরবে। সে কথাই সত্যি হয়ে গেল!’
কী হবে আমিন মাঝির পরিবারের
আমিন মাঝির বাড়ি মগধরা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে। তার দুই মেয়ে ও তিন ছেলে। তিনি ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাকে হারিয়ে পরিবারটি কীভাবে দিন কাটাবে, কীভাবে চলবে তাদের সংসার; সে প্রশ্নের উত্তর মিলছে না।
একসঙ্গে মৃত্যু
সন্দ্বীপের সারিকাইত ইউনিয়নের মুন্সি বাড়ি ও মনু মিয়ার বাড়িতে চলছে আহাজারি। নিহত বাবলু ও শাহাবুদ্দিন এই দুই বাড়ির সন্তান। ছোট বেলা থেকেই বেড়ে উঠছেন একসঙ্গে, বিদেশেও একসঙ্গেই কাজ করতেন। মৃত্যুর সময়ও একসঙ্গেই ছিলেন না, কফিনবন্দী হয়ে ফিরেছেনও একই সঙ্গে।
কাকে বাবা ডাকবে আনিসা?
নিহত আরজুর তিন বছরের মেয়ে আনিসার দিকে তাকিয়ে হাহাকার করছিলেন আরজুর বাবা শহিদুল্লাহ। হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, ‘আমার নাতনি আনিসার বয়স তিন বছর। এখন কাকে বাবা ডাকবে সে?’
শহিদুল্লাহর এই প্রশ্নের উত্তর নেই। কী হবে পরিবারগুলোর তাও অজানা। হয়ত সরকারি সহায়তা মিলবে, দিনও কেটে যাবে দিনের মতো। কিন্তু স্বজন হারানোর যে বেদনার মধ্য দিয়ে পরিবারের সদস্যরা যাবেন, সেই শোকের কোনো শেষ নেই, নেই সান্তনাও।


