চিত্রনায়ক সালমান শাহ’র মৃত্যুর প্রায় ৩০ বছর পর তার দেহাবশেষ কবর থেকে উত্তোলনের আদেশ বাতিল চেয়ে করা বাদীর আবেদন নথিভুক্ত করেছে আদালত।
মঙ্গলবার সকালে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জুয়েল রানার আদালতে মামলার বাদী মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম উত্তোলনের আদেশ বাতিল চেয়ে আবেদন করেন।
শুনানি শেষে সকালে বিচারকের উপস্থিতিতে এক পুলিশ কর্মকর্তা বিচারকের আদেশ পড়ে শুনিয়ে জানান, বাদীপক্ষের আবেদন মঞ্জুর করা হয়েছে। পূর্বের লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল করা হইল। সেই অনুযায়ী বিভিন্ন গণমাধ্যমে ‘লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল করা হয়েছে’ বলে সংবাদ প্রচারিত হয়।
পরবর্তীতে প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক শাহ আলম নিশ্চিত করেন, লাশ উত্তোলন আদেশ বাতিল হয়নি, বাদীপক্ষের আবেদনটি নথিভুক্ত রাখা হয়েছে।
এ বিষয়ে বাদীপক্ষের আইনজীবী আবিদ হাসান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সকালে প্রকাশ্যে আদালত সালমান শাহ’র দেহাবশেষ উত্তোলনের আদেশ বাতিল করেন। কিন্ত দুপুরে শুনছি আদেশ নাকি নথিভুক্ত করা হয়েছে। বিষয়টি আমার বোধগম্য হচ্ছে না। বিচার বিভাগের সকল কাজে আরও স্বচ্ছতা থাকা উচিত।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রকাশ্য আদালতে বিচারকের সামনে আদেশ ঘোষণা করা হয়েছে। বিচারকের সামনে এমন ভুল হওয়ার কোন সুযোগ নেই। কিভাবে হয়েছে আমার বোধগম্য হচ্ছে না।’
এদিকে, সালমান শাহ’র মামা ও মামলার বাদী আলমগীর কুমকুম বলেন, ‘আমি কাঠগড়ায় দাড়িয়ে যখন আবেদন করি তখন আদালত বলেন এক্সেপটেড (গ্রহণ)। আমি নিজের কানে শুনেছি। কিন্তু হঠাৎ করে শুনছি নথিভুক্ত হয়েছে। এটা কিভাবে সম্ভব!’
এ বিষয়ে প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক শাহ আলম জানান, ‘প্রকাশ্য আদালতে আমাদের এক পুলিশ কর্মকর্তা ভুল আদেশ ঘোষণা করেছিলেন। আসলে আদালত আবেদনটি নথিভুক্ত করেছেন।’
বাদী পক্ষের আবেদনে বলা হয়, বহুল আলোচিত চিত্রনায়ক সালমান শাহ’র মরদেহ শাহজালাল (রহ:) এর মাজার প্রাঙ্গণে দাফন করা হয়েছিল এবং বর্তমানে সেখানেই কবরস্থ আছে। ভিকটিমের দেহাবশেষ উত্তোলনের ক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত আনা হবে এবং ব্যাপক বাধার সৃষ্টি হতে পারে। এতে বাদী মো. আলমগীর কুমকুম এবং মা নিলুফাজামান চৌধুরী ওরফ নীলা চৌধুরীর আপত্তি রয়েছে। এজন্য আলোচিত চিত্রনায়ক সালমান শাহ’র মরদেহ উত্তোলনের আদেশ বাতিল করা প্রয়োজন।
শুনানির সময় মামলার বাদী ও নিহতের মামা মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে চলতি বছরের ২০ মে সিআইডির পরিদর্শক জিয়াউল মোর্শেদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১০ জুন মৃত্যুর রহস্য উদঘাটনের লক্ষ্যে তার মরদেহ কবর থেকে উত্তোলনের অনুমতি দিয়েছিল আদালত।
আবেদনে বলা হয়, সালমান শাহ’র মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনের স্বার্থে মরদেহ পুনরায় পরীক্ষা করা জরুরি। আদালত আবেদন মঞ্জুর করার পর প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে লাশ উত্তোলন ও ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হবে বলে জানানো হয়।
মামলার নথি অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সকালে নিউ ইস্কাটন রোডের বাসায় সালমান শাহকে অসুস্থ অবস্থায় পাওয়া যায়। দ্রুত তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। ওই সময় রমনা থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয় এবং পরে সিলেটের শাহজালাল (রহ.) মাজার প্রাঙ্গণে তাকে দাফন করা হয়।
পরবর্তীতে দীর্ঘ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর সালমান শাহ’র মামা মো. আলমগীর রমনা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় একাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছেন তার স্ত্রী সামিরা হক, শিল্পপতি ও প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাইসহ আরও অনেকে।
এর আগে ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত মামলাটি অপমৃত্যু থেকে পরিবর্তন করে হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, সালমান শাহ’র মৃত্যু ঘিরে সন্দেহজনক পরিস্থিতি, শরীরে আঘাতের চিহ্ন এবং ঘটনাস্থলের বিভিন্ন অসঙ্গতি পুনরায় তদন্তের প্রয়োজন তৈরি করেছে। সেই কারণেই মৃত্যুর প্রকৃত সত্য উদঘাটনে নতুন করে ময়নাতদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালে সালমান শাহ’র মৃত্যুর পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে জনমনে নানা বিতর্ক ও সন্দেহ রয়ে গেছে। আদালতের সাম্প্রতিক নির্দেশের পর মামলাটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে এবং চলচ্চিত্র অঙ্গনে আবারও চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।


