বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে অস্ট্রিয়া এমন এক নাম, যার অতীত রূপকথার মতো সুন্দর আর বর্তমান এক নতুন বিপ্লবের গল্প। আল্পস পর্বতমালার এই দেশটি আধুনিক ফুটবলেও যেকোনো পরাশক্তির রক্তচাপ বাড়িয়ে দেওয়ার দারুণ এক ক্ষমতা অর্জন করেছে। অষ্ট্রিয়ার ঝুলিতে আছে নিকট অতীতে জার্মানি ও ইতালির মতো ফুটবল পরাশক্তিকে পরাজিত করার সুখকর অভিজ্ঞতা।
ইতিহাস এবং বর্তমানের এই মেলবন্ধনে অস্ট্রিয়া আজ বৈশ্বিক ফুটবলে এক সমীহ জাগানিয়া দল। যেকোনো সময় যেকোনো অঘটন ঘটাতে পারে তারা।
অস্ট্রিয়ার ফুটবল ইতিহাসের পাতা ওল্টালে প্রথমেই চোখে পড়ে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের সেই সোনালি অধ্যায়। ১৯৩০-এর দশকে দলটিকে ডাকা হতো ‘উন্ডারটিম’ বা বিস্ময়কর দল হিসেবে। সেই যুগের অস্ট্রিয়া ছিল অপ্রতিরোধ্য। ১৯৩৪ সালের বিশ্বকাপে চতুর্থ স্থান এবং ১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিকে রৌপ্য পদক জয় ছিল তাদের সেই সোনালি যুগেরই ফসল। সেন্ট্রাল ইউরোপিয়ান ইন্টারন্যাশনাল কাপে চ্যাম্পিয়ন হয়ে তারা প্রমাণ করেছিল, ইউরোপের সেরা শক্তি হওয়ার যোগ্যতা তাদের রক্তে মিশে আছে।
তবে বিশ্বমঞ্চে দলটির সর্বোচ্চ সাফল্য আসে ১৯৫৪ সালের সুইজারল্যান্ড বিশ্বকাপে। সেবার স্বাগতিকদের সাথে ৭-৫ গোলের এক ঐতিহাসিক মহাকাব্যিক ম্যাচ জিতে সেমিফাইনালে পা রাখে তারা। শেষ পর্যন্ত উরুগুয়েকে হারিয়ে তৃতীয় স্থান অর্জন করা অস্ট্রিয়ার ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা গৌরবময় মুহূর্ত হিসেবে অমর হয়ে আছে।
ঐতিহাসিকভাবে ফুটবল পরাশক্তিদের জন্য অস্ট্রিয়া সবসময়ই এক কঠিন ধাঁধার নাম। বিশ্বকাপ বা বড় মঞ্চে ব্রাজিল, জার্মানি কিংবা ইতালির মতো পরাশক্তিদের বিপক্ষে তাদের পরিসংখ্যান মলিন হলেও মাঠের লড়াইয়ে তারা কখনোই সহজে অস্ত্র সমর্পণ করেনি। বরং ফ্রান্স ও স্পেনের মতো বিশ্বজয়ীদের বড় মঞ্চে হারানোর গৌরবময় স্মৃতি আছে দলটির। প্রীতি ম্যাচ হোক কিংবা মহাদেশীয় লড়াই, অস্ট্রিয়া তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী জার্মানি কিংবা শক্তিশালী ইতালিকে বারবারই মাঠের তীব্র লড়াইয়ে পরীক্ষা নিয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও জার্মানি ও ইতালিকে প্রীতি ম্যাচে ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে তারা জানান দিয়েছে যে, অতীত ঐতিহ্যকে তারা স্রেফ স্মৃতিকথায় বন্দি রাখতে রাজি নয়।
দীর্ঘদিন বিশ্বমঞ্চের আড়ালে থাকার পর, আধুনিক ফুটবলে অস্ট্রিয়ার পুনরুত্থান ঘটেছে মাস্টারমাইন্ড কোচ রালফ রাংনিকের ছোঁয়ায়। হাই-প্রেসিং আর গতিময় আধুনিক ফুটবলের মিশেলে রাংনিক এই দলটিকে পরিণত করেছেন সমীহ জাগানো শক্তিতে। ইউরো ২০২০ এবং ইউরো ২০২৪-এর মঞ্চে তাদের পারফরম্যান্স ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ইউরোতে ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডসের মতো জায়ান্টদের গ্রুপে থেকেও সবাইকে চমকে দিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নকআউট পর্বে পা রাখে অস্ট্রিয়া। এই ধারাবাহিকতা ধরে রেখেই দীর্ঘ ২৮ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে তারা জায়গা করে নিয়েছে ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে।
অতীতের সেই ‘উন্ডারটিম’ আর বর্তমানের এই লড়াকু অস্ট্রিয়া—দুই যুগের দর্শনেই মিল রয়েছে এক জায়গায়, তা হলো বড় মঞ্চে বুক চিতিয়ে লড়াই করার মানসিকতা। ২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করার পর এবার বিশ্বমঞ্চে নিজেদের চেনানোর পালা। প্রথম ম্যাচেই জর্ডানের বিপক্ষে ৩-১ গোলের জয় পেয়েছে তারা।
মাঠের লড়াকু ফুটবল আর তরুণ-অভিজ্ঞদের দারুণ ভারসাম্যে রাংনিকের অস্ট্রিয়া এখন কেবল অতীত রোমন্থনে সীমাবদ্ধ নয়, বরং বিশ্ব ফুটবলের পরাশক্তিদের চোখে চোখ রেখে নতুন ইতিহাস লেখার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।


