খুলনা বিভাগ ঘুরে এসে: আসন্ন সংসদ নির্বাচনে খুলনা বিভাগের ৩৬ আসনের মধ্যে ১৪টিতে প্রার্থী নিয়ে ‘নাখোশ’ বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। এসব আসনে তুলনামূলক ‘কম জনপ্রিয়’ প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়ার অভিযোগে দলটির নেতাকর্মীদের মাঝে তৈরি হয়েছে ক্ষোভ ও হতাশা। এমন পরিস্থিতি অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন দল বা স্বতন্ত্র প্রার্থীকে সুযোগ তৈরি করে দিতে পারে বলে আভাস মিলছে।
নেতাকর্মীদের ভাষ্যমতে, খুলনা বিভাগের ১০ জেলার মধ্যে সাতক্ষীরা ২টি, যশোরের ৩টি, বাগেরহাটের ২টি, ঝিনাইদহের ২টি এবং খুলনা, নড়াইল, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও মাগুরায় একটি করে আসনে বিএনপি মনোনীতদের চেয়ে ‘জনপ্রিয় প্রার্থী’ ছিল। কিন্তু নানা কারণে তারা বঞ্চিত হয়েছেন।
সরেজমিনে এসব আসন ঘুরে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নেতাকর্মীদের অভিযোগের সত্যতাও মিলেছে।
মনোনয়ন না পাওয়ায় পোড় খাওয়া বিএনপির কয়েকজন নেতা টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, “বিভাগীয় টিম বা যেসব নেতারা মনোনয়ন দেয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করেছেন তারা কেন্দ্রকে ভুল বার্তা দিয়েছেন। যার নেপথ্যে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে সামনে আনা অথবা ‘ভিন্ন কারণ’ রয়েছে।
অবশ্য বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, নানা হিসাব-নিকাশ করেই প্রার্থীদের মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় নেতারা যাই বলুন, এসব নির্বাচনী এলাকার চায়ের দোকান থেকে সর্বত্র এখন প্রার্থীর দুর্বলতা নিয়ে নানা আলোচনা চলছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির নজরুল ইসলাম খান টাইমসকে বলেন, ‘বড় দলগুলোতে এক আসনে একাধিক প্রার্থী মনোনয়নের উপযোগী থাকে। একজনকে মনোনয়ন দেয়ায় অনেকে অসন্তুষ্ট হন। আবার অনেক আসনে সমমনা বা শরিক দল রয়েছে, যারা দীর্ঘদিন আমাদের সঙ্গে রাজপথে ছিলেন তাদের বিষয় রয়েছে।’ অনেকে অসন্তুষ্ট থাকলেও কিছুটা শেষ সময়ে সব ঠিক হয়ে যাবে বলেও মনে করেন নজরুল ইসলাম খান।
বিএনপির একাধিক সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগ নির্বাচনের বাইরে থাকায় বিএনপি নানা কারণে শরীক বা সমমনাদের আসন ছেড়ে দিয়ে সন্তুষ্ট রাখতে চাইছে। সেই হিসেবে অনেকে আসনে জনপ্রিয় প্রার্থীদেরকে বাদ দিয়ে সমমনা বা হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাকে দলের এনে মনোনয়ন দিয়েছে।
সদর ও দেবহাটা মিলে গঠিত সাতক্ষীরা-২ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন দল থেকে বহিস্কৃত নেতা আব্দুর রউফ। সরকার পতনের পর তার বিরুদ্ধে বাস টার্মিনাল, ভোমরা সিএন্ডএফ এজেন্ট ও ভাইপো আবু সাঈদকে দিয়ে মূলধারার সাংবাদিকদের বাইরে রেখে সাতক্ষীরা প্রেসক্লাব দখলে নিয়ে বারবার পত্রিকার শিরোনাম হয়েছেন তিনি।
গত সপ্তাহে সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ (বালক) বিদ্যালয় সংলগ্ন আমতলা মোড়ের একটি চায়ের দোকানে বসে কথা হয় জেলা বিএনপির একজন যুগ্ম-আহ্বায়কের সঙ্গে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি টাইমসকে বলেন, ‘জামায়াতের জনপ্রিয়তা বেশি থাকলেও সাতক্ষীরা-২ আসনে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক রহমতুল্লাহ পলাশ ও সাবেক সদস্য সচিব আব্দুল আলিমের মধ্যে যেকোন একজনকে মনোনয়ন দিলে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতো। কিন্তু বিতর্কিত রউফকে মনোনয়ন দেয়ার জামায়াতের প্রার্থী আব্দুল খালেকের জয় সহজ হতে পারে।’
সাতক্ষীরা-৩ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন সাবেক এমপি কাজী আলাউদ্দিন। এখানে দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য বিশিষ্ট চিকিসক শহিদুল আলম মনোনয়ন চেয়েও পাননি। তাকে মনোনয়ন দেয়ার দাবিতে মাসব্যাপী কর্মসূচি পালন করেছেন তার অনুসারীরা। নেতাকর্মীদের কাছে জনপ্রিয় শহীদুল আলম স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। শহীদুল আলমকে মনোনয়ন দেয়া হলে আসনটিতে বিএনপির জন্যে সম্ভবনাময় ছিল।
শহিদুল আলম টাইমসকে বলেন, ‘সাতক্ষীরার বেশিরভাগ আসনে জনপ্রিয় প্রার্থীদের মনোনয়ন দেয়া হয়নি। এর জন্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগীয় টিমকে তিনি দায়ী করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, নিজেদের স্বার্থে কেন্দ্রে ভুল বার্তা দিয়ে জনপ্রিয় অনেক প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়নি বিভাগীয় টিম।’
যশোর-১ আসনে কেন্দ্রীয় বিএনপির সাবেক দপ্তর সম্পাদক মফিকুল হাসান তৃপ্তি প্রাথমিক মনোনয়ন পান। পরে তাকে প্রত্যাহার করে নুরুজ্জামান লিটকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। এই আসনের বেনাপোল, পুটখালী, গোগা এবং উলশী গ্রামের ভোটারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেখানে তৃপ্তির জনপ্রিয়তা বেশি।
যশোর-৫ (মনিরামপুর) আসনে প্রথমে উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র শহীদ মোহম্মদ ইকবাল হোসেনকে মনোনয়ন দিয়েছিল বিএনপি। কিন্তু পরে তাকে প্রত্যাহার করে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতা রশীদ বিন ওয়াক্কাসকে ‘ধানের শীষে’র প্রার্থী করা হয়েছে। এলাকায় তার তেমন পরিচিত নেই। শহীদ ইকবাল এখন স্বতন্ত্র প্রার্থী।
উপজেলার বিজয়রামপুর, জালঝাড়া ও হোগলাডাঙ্গা গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বিএনপির বেশিরভাগ কর্মী স্বতন্ত্র প্রার্থী শহীদ ইকবালের জন্যে কাজ করছেন। উপজেলার বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি মফিজুর রহমান বলেন, “দল যাকে মনোনয়ন দিয়েছেন তাকে পাশ করানো সম্ভব নয়। তাই আমরা উপজেলা বিএনপির সভাপতির জন্যে কাজ করছি।”
যশোর-৬ আসনে ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণকে প্রাথমিক মনোনয়ন দেয়া হয়। রাজনৈতিকভাবে পরিবারিক আদর্শের বিপরীতে গিয়ে ছাত্রদলের সভাপতি পদে আসীন হওয়া শ্রাবণের মনোনয়নের খবরে কেশবপুর উপজেলায় নেতাকর্মীদের মাঝে এক ধরণের আবেগ ও উচ্ছ্বাসের সৃষ্টি হয়।
পরবর্তীতে তার পরিবর্তে উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুল হোসেন আজাদকে মনোনয়ন দেওয়ায় সেই উচ্ছ্বাসে ভাটা পড়েছে।
ঝিনাইদহ-৪ আসন গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক থেকে থেকে সদ্য পদত্যাগ করা রাশেদ খাঁনকে বিএনপি মনোনয়ন দিয়েছে। কেন্দ্রীয় সেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা সাইফুল ইসলাম ফিরোজ এ আসনের জনপ্রিয় প্রার্থী ছিলেন। তিনি মনোনয়ন পেলে এই আসনে বিএনপির জয় সহজ ছিল।
সরেজমিনে এই আসনের হাট বারোবাজারে গিয়ে দেখা গেছে, বিএনপির নেতাটকর্মীরা ফিরোজের পক্ষে মাঠে নেমেছেন।
সাইফুল ইসলাম ফিরোজ বলেন, ‘মনোনয়নে জড়িত স্থানীয় একটি সিন্ডিকেটের কারণে জনপ্রিয় অনেকে বাদ পড়েছেন। যা ফলাফলে ব্যাপক প্রভাব পড়বে।’
কোটচাঁদপুর-মহেশপুর উপজেলা নিয়ে ঝিনাইদহ-৩ আসন। এখানে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন মেহেদী হাসান রনি। তিনি এই আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলামের ছেলে। এ আসনে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজলকে প্রার্থী করা হলে অপর প্রার্থী জামায়াতের মতিয়ার রহমানের সাথে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হওয়ার সম্ভবনা ছিল।
চিতলমারী, মোল্লাহাট ও ফকিরহাট এই তিন উপজেলা নিয়ে বাগেরহাট-১ আসন। এখানে বিএনপির প্রার্থী করা হয়েছে, আওয়ামী লীগের পদধারী সাবেক নেতা কপিল কৃষ্ণ মন্ডলকে। জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির সদস্য শেখ মাসুদ রানা ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমটির সদস্য অহিদুজ্জামান দিপুর মধ্যে যেকোন একজনকে মনোনয়নের প্রত্যাশা ছিল নেতাকর্মীদের। এই আসনে এখন বিএনপির দুইজন স্বতন্ত্র প্রার্থী।
মোরেলগঞ্জ, শরণখোলা উপজেলা ও মোরেলগঞ্জ পৌরসভা নিয়ে গঠিত বাগেরহাট-৪ আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম ও স্থানীয় বিএনপি নেতা কাজী খাইরুজ্জামান শিপন সহ দলীয় অনেকেই মনোনয়নের চেষ্টা করেছেন। তবে শেষ পর্যন্ত উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সদস্য ও সনাতন ধর্মীয় নেতা সোমনাথ দে’কে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। স্থানীয় বেশিরভাগ নেতাকর্মীদের এখন প্রচার-প্রচারণায় দেখা যাচ্ছে না। এখানে দুর্বল প্রার্থীর সুযোগ কাজে লাগাচ্ছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আব্দুল আলিম।
নড়াইল- ২ আসনে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে বিএনপির সমমনা দল এনপিপির চেয়ারম্যান ড.ফরিদুজ্জামান ফরহাদকে। প্রতিবাদে সেখানকার জনপ্রিয় প্রার্থী জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় জামায়াতের প্রার্থী আতাউর রহমান বাচ্চু ফুরফুরে মেজাজে রয়েছেন।
জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব মনিরুল হাসান বাপ্পীকে খুলনা-৬ আসনে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। তিনি ওই এলাকায় খুব একটা পরিচিত নন। তার পরিবর্তে খুলনা মহানগর শফিকুল আলম মনা ওই আসনের বেশি জনপ্রিয় প্রার্থী বলে নেতাকর্মীদের বড় অংশের দাবি।
মেহেরপুরের গাংনী উপজেলা নিয়ে গঠিত মেহেরপুর-২ বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য আমজাদ হোসেনকে। এই প্রার্থী পরিবর্তনের জন্য জেলা বিএনপির সভাপতি জাবেদ মাসুদ মিল্টনের সমর্থকরা দীর্ঘ এক মাস বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন। নেতাকর্মীদের জনপ্রিয় প্রার্থী মিল্টনকে মনোনয়ন না দেয়ায় জামায়াত ইসলামের প্রার্থী নাজমুল হুদা লাভবান হচ্ছেন।
কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর ভেড়ামারা) আসনে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন ব্যারিস্টার রাগিব রউফ চৌধুরী। এখানে মনোনয়ন বঞ্চিত হয়েছেন একাধিকবার নির্বাচিত সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম। অথচ দলের বেশিরভাগ নেতাকর্মী এখনো তার সাথেই রয়েছেন। মনোনয়ন বঞ্চিত হওয়ায় অধ্যাপক শহিদুল ইসলামের কর্মী সমর্থকরা চরম ক্ষুব্ধ।
মাগুরা-২ আসনে ব্যাপক পরিচিত প্রার্থী হলেও দলীয় কোন্দলের কারণে বিএনপি মনোনয়নপ্রাপ্ত বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা নিতাই রায় চৌধুরীর জনপ্রিয়তা ভাটা নেমেছে। এ আসনের সাবেক এমপি ও শিল্পপতি কাজী সালিমুল হক কামালকে মনোনয়ন দেয়া হবে বলে দলটির সাধারণ নেতাকর্মীরা আশা করেছিলেন। তাকে মনোনয়ন না দেওয়ায় দলের নেতাকর্মীদের বড় অংশ ক্ষুব্ধ।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বিএনপির কর্মীদের কাছে জনপ্রিয় এমন প্রার্থীকে বাদ দেওয়ার সুবিধা পাচ্ছেন জামায়াত জোটের প্রার্থীরা। অনেক আসনে স্বতন্ত্র অনেক প্রার্থী সুবিধা পাচ্ছেন।
তবে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, নির্বাচনের এখনো এক মাসের বেশি সময় বাকি। তাই শেষ সময়ে এমন বিভিন্ন আসনের হিসাব-নিকাশে পরিবর্তন আসতে পারে। মনোনয়নকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট কোন্দল মেটাতেও উদ্যোগ নিচ্ছে দলের হাইকমান্ড।


