সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বজ্রপাত থেকে মানুষের জীবন বাঁচাতে সরকারের নেওয়া কোটি টাকার প্রকল্প ভেস্তে গেছে। এক দশকে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ২৪টি বজ্রনিরোধক দণ্ড বসানো এবং লাখের বেশি তালগাছ লাগানোর কথা থাকলেও বাস্তবে তার কোনো সুফল মিলছে না। দেখভালের অভাবে রোপণ করা লাখো তালগাছ মাঠ থেকে উধাও হয়ে গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের নামে সরকারি টাকা হরিলুট করে কেবল নিজেদের পকেট ভারী করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও বিগত সরকারের নেতারা। ফলে কোটি কোটি টাকা খরচ হলেও হাওরবাসীর কোনো লাভ হয়নি, বরং বজ্রপাতে মৃত্যুর মিছিল দিন দিন আরও দীর্ঘ হচ্ছে।
সরকারি হিসাব মতেই এ জেলায় গত ৫ বছরে বজ্রপাতে ৬৮ জন মারা গেছেন। সর্বশেষ গত ১৮ এপ্রিল এক দিনেই বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন ৫ জন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জে প্রতি বছর মার্চ থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত হাওরবাসীর মনে বজ্রপাতের আতঙ্ক তাড়া করে ফেরে। বিশেষ করে মার্চ ও এপ্রিল মাসে বোরো ধান কাটা ও শুকানোর সময় এই ভয় সবচেয়ে বেশি থাকে। এ সময় কালবৈশাখী ঝড়ের সাথে প্রচণ্ড বজ্রপাত হয়। বোরো ধান ঘরে তোলার কাজে এই সময়টাতে হাওরের খোলা মাঠে লাখ লাখ কৃষক ও শ্রমিক ব্যস্ত থাকেন। হঠাৎ বজ্রপাত শুরু হলে আশ্রয় নেওয়ার মতো কোনো জায়গা না থাকায় মাঠেই মারা যান অনেকে। এতে সবচেয়ে বেশি হতাহত হন দরিদ্র কৃষক ও জেলে পরিবারের সদস্যরা।
সাধারণ মানুষের এই জীবন-মরণ সমস্যা দূর করতে সরকার কোটি টাকা খরচ করলেও দুর্নীতির কারণে তার কোনো ফল পাচ্ছে না হাওরের মানুষ।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বজ্রপাতের ক্ষতি কমাতে ২০১৮ সালে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় কাবিটা ও কাবিখা প্রকল্পের আওতায় এক লাখ তালগাছ লাগানো হয়েছিল। এরপর ২০২৪ সালে লাগানো হয় আরও দুই হাজার গাছ। তবে বর্তমানে মাঠ পর্যায়ে এসব তালগাছের কোনো অস্তিত্ব নেই। পরিচর্যা ও সুরক্ষার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় চারাগুলো মরে গেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নথিপত্রে যেসব জায়গায় গাছ লাগানোর কথা বলা হয়েছিল, সেখানে এখন ফাঁকা মাঠ। কোথাও কোথাও দুই-তিন কিলোমিটার দূরে সামান্য কিছু চারা পাওয়া গেলেও আট বছরে সেগুলো মাত্র এক থেকে দেড় ফুট বড় হয়েছে। নামমাত্র চারা দেখিয়ে প্রকল্পের সব টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার জগাইরগাঁও গ্রামের বাসিন্দা সামছুল ইসলাম বলেন, যখন তালগাছের চারা লাগানো হয়েছিল, তখন মাত্র দু’একদিন লোকদেখানো যত্ন করা হয়েছে। এরপর আর কেউ এগুলোর খবর নেয়নি, তাই এখন আর কোনো গাছের অস্তিত্ব নেই। বেড়াজালি গ্রামের বাসিন্দা কামাল হোসেন সরাসরি অভিযোগ করে বলেন, বিগত সরকারের আমলে নেতারা এসব প্রকল্পের নামে শুধু নিজেদের পকেট ভারী করেছেন। এ লুটের কারণেই এখন কোনো তালগাছ চোখে পড়ে না।
তালগাছ প্রকল্পের পাশাপাশি বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপনের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দুর্যোগ, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয় এক কোটি ১০ লাখ টাকা খরচ করে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জেলার ছয়টি উপজেলায় ১৮টি বজ্রনিরোধক দণ্ড বসায়। ‘ক্রিয়েটিভ সোলার অ্যান্ড টেকনোলজি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান এই কাজ করে। এর মধ্যে সুনামগঞ্জ সদরে ৪টি, জামালগঞ্জে ৩টি, তাহিরপুরে ৩টি, বিশ্বম্ভরপুরে ৩টি, ধর্মপাশায় ৩টি এবং শাল্লা উপজেলায় ২টি দণ্ড রয়েছে। তবে বিশাল হাওর এলাকার তুলনায় এই দণ্ডের সংখ্যা যেমন খুবই কম, তেমনি এগুলো আদৌ সচল আছে কি না তা নিয়ে মানুষের মনে সন্দেহ রয়েছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, জেলায় গত পাঁচ বছরে বজ্রপাতে ৬৮ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে ২০২২ সালে ৬ জন, ২০২৩ সালে ২৯ জন, ২০২৪ সালে ১১ জন, ২০২৫ সালে ১৫ জন এবং ২০২৬ সালের চলতি বছরের বুধবার পর্যন্ত ৭ জন মারা গেছেন। তবে বেসরকারি হিসাবে মৃত্যুর এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি।
হাওর গবেষক সালেহীন চৌধুরী শুভ বলেন, তালগাছ রোপণের এই প্রকল্পটি আসলে ছিল লুটপাটের একটি উছিলা। এই ধরনের ব্যর্থ ও দুর্নীতিগ্রস্ত প্রকল্প বাদ দিয়ে হাওর এলাকায় বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে আরও বেশি করে বজ্রনিরোধক দণ্ড বসানো দরকার।
অন্য দিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার জানান, তারা কৃষকদের স্বার্থে হাওর এলাকায় সেড বা বিশেষ আশ্রয়কেন্দ্র তৈরির একটি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন।
কোটি টাকার চারা উধাও হওয়ার বিষয়ে জেলা প্রশাসক মিনহাজুর রহমান জানান, রোপণ করা লক্ষাধিক তালগাছ কেন এবং কিভাবে হারিয়ে গেল সেই বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চেয়ে তারা ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন। এর পাশাপাশি হাওরের কৃষকদের সচেতন করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কাজ করা হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।


