খালেদা জিয়া। বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যিনি ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে রাজনীতিতে এসেছিলেন ইতিহাসের ক্রান্তিকালে। এক সাধারণ গৃহবধূ থেকে তিনি রাজনীতির মাঠে পরিণত হয়েছিলেন ‘আপসহীন নেত্রী’তে। তিনি এমন এক নারী যার পদচিহ্নে লেখা আছে সংগ্রাম, দৃঢ়তা আর অটল দেশপ্রেমের কাব্য। স্বামী স্বাধীনতার ঘোষক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আকস্মিক শাহাদাতের পর তিনি যখন রাজনীতির রণক্ষেত্রে পা রাখেন, তখন কেউ ভাবেনি এই নির্বাক শোকই একদিন পুরো জাতির কণ্ঠস্বর হয়ে উঠবে।
রাজনীতির মঞ্চে আগমন
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে নৃশংস হত্যাকাণ্ডে জিয়াউর রহমান শহীদ হলে বিএনপি যেন নেতৃত্বহীন হয়ে পড়ে। এই শূন্যতার মধ্যে ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি খালেদা জিয়া দলে প্রাথমিক সদস্য হিসেবে যোগ দেন। মাত্র আড়াই মাসের মধ্যে, ২৪ মার্চ এরশাদ সামরিক আইন জারি করলে তিনি ঘরের নিরাপদ আশ্রয় ত্যাগ করে রাজপথে নেমে আসেন। শোকের কালো চাদর গায়ে জড়িয়ে তিনি হয়ে ওঠেন স্বৈরাচারের বিরোধী প্রতিবাদের প্রতীক।
১৯৮৪ সালের ১০ মে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি বিএনপির চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হন। এরপর থেকে শুরু হয় তার নেতৃত্বে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের নয় বছরের অবিরাম লড়াই।
স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলন
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের সোনালী সময় এরশাদ–বিরোধী আন্দোলন। ১৯৮৩ সালে তার নেতৃত্বে গঠিত হয় সাতদলীয় জোট। এসময় তিনি কোনো প্রলোভনেই বিচলিত হননি, কোনো সমঝোতার জালে পা দেননি। এই আপোষহীনতার মূল্য দিতে হয়েছে বারবার গ্রেপ্তার, দীর্ঘ গৃহবন্দীত্ব আর নির্যাতনের মধ্যে দিয়ে। তিনবার কারাবরণ করেন – ১৯৮৩, ১৯৮৪ ও ১৯৮৭ সালে। বছরের পর বছর ক্যান্টনমেন্টের শহীদ মইনুল রোডের বাসভবনে তিনি ছিলেন কার্যত গৃহবন্দী। কিন্তু তার চোখের আগুন নিভেনি।
১৯৯০ সালের ঐতিহাসিক গণ–অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তিনি এরশাদকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করেন। সেবছর ৬ ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন এরশাদ। এই দিনটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে খালেদা জিয়ার আপোষহীন সংগ্রামের কারণে।

প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া
১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় বিএনপি। পাঁচটি আসন থেকে লড়ে সবকটিতে জয়ী হয়ে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন খালেদা জিয়া। তার প্রথম মেয়াদে দেশ ফিরে যায় সংসদীয় গণতন্ত্রে।
১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করে তিনি ক্ষমতা হস্তান্তর করেন – যা ছিল গণতন্ত্রের প্রতি তার অগাধ শ্রদ্ধার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
২০০১ সালে চারদলীয় জোটের বিপুল বিজয়ের পর দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হন। এই দুই মেয়াদে বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, যমুনা সেতু নির্মাণের ভিত্তি স্থাপন এবং সার্ককে গতিশীল করার ক্ষেত্রে অবিস্মরণীয় ভূমিকা রাখেন খালেদা জিয়া।
তবে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, বহুল আলোচিত ‘বাংলা ভাই’ সহ ধর্মীয় জঙ্গীবাদের উত্থান, সারাদেশে একযোগে আদালত চত্বরে হামলা, সর্বোপরি বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার উপর গ্রেনেড হামলার ঘটনায় সমালোচিত হয় বিএনপির সেই শাসনকাল।
সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক আমল
২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আবারও গ্রেপ্তার হন খালেদা জিয়া। তখন বাংলাদেশে শুরু হয় বিরাজনীতিকরণের এক কৌশল-‘মাইনাস টু ফর্মুলা’। রাজনীতি থেকে খালেদা জিয়া এবং আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে নির্বাসনে পাঠানোর চেষ্টা করে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। নানাভাবে খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানোর চেষ্টা করলেও তিনি ছিলেন অনড়–বিদেশে যাবেন না। এসময় তিনি দৃঢ়কণ্ঠে উচ্চারণ করেন: ‘বিদেশে আমার কোনো ঠিকানা নেই।’ প্রায় এক বছর কারাবাসের পর শেষ পর্যন্ত ২০০৮ সালে তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার।

আওয়ামী লীগের শাসনামল
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় এলে বিএনপির ওপর শুরু হয় দমন–নিপীড়ন। দলের শীর্ষ নেত্রী হিসাবে খালেদা জিয়ার ওপরও খড়গহস্ত হয় আওয়ামী লীগ সরকার। একাধিক মামলায় তাঁকে অভিযুক্ত করা হয়।
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় তাঁকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেয় নিম্ন আদালত। পুরান ঢাকার পুরনো কারাগারে আবারও বন্দী হন খালেদা জিয়া। পরবর্তীতে একাধিক মামলায় সাজা হয়।
খালেদা জিয়া কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়লে বার বার চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সরকার তাকে সেই সুযোগ দেয়নি। এমনকি দেশের ভেতরেও কোনো বেসরকারি হাসপাতালে যেতে দেওয়া হয়নি।
দিনে দিনে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। অবশেষে ২০২০ সালে করোনা মহামারীর মধ্যে নির্বাহী আদেশে দণ্ড স্থগিত করে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। তবে শর্ত দেওয়া হয় তিনি রাজনীতি করতে পারবেন না, বিদেশেও যেতে পারবেন না। আওয়ামী লীগের এই শাসনকালে তিনি ছিলেন গুলশানের বাসভবনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কার্যত গৃহবন্দী।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আদালতে সকল মামলা থেকে খালাস পান খালেদা জিয়া। সেদিন থেকে তিনি ছিলেন মুক্ত মানুষ, তবে ততদিনে অসুস্থতার কারণে শারীরিকভাবে প্রায় ভেঙে পড়েন। তার আর স্বাভাবিক চলাফেরার শক্তি ছিল না।
খালেদা জিয়ার জীবন এক অসামান্য রূপকথা। শোককে শক্তিতে, দুঃখকে দুর্জয় স্পিরিটে রূপান্তরিত করার কাহিনী। তিনি দেখিয়ে গেছেন, একজন নারী যখন মাতৃভূমির জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেন, তখন স্বৈরাচারও মাথা নত করে। তিনবার প্রধানমন্ত্রী, বহুবার বিরোধীদলীয় নেত্রী, অনেকবার কারাবরণ – তবু গণতন্ত্রের প্রশ্নে, দেশপ্রেমের প্রশ্নে তার মনোভাব ছিল আপোষহীন।
যতদিন বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের কথা বলা হবে, ততদিন খালেদা জিয়ার নাম উচ্চারিত হবে শ্রদ্ধা, গর্ব আর অবিচল সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে।


