অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক চাপে পড়ে এক কঠিন সময় পার করছে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাত। বৈশ্বিক মন্দা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ভূরাজনৈতিক উত্তজনার পাশাপাশি দেশীয় জ্বালানি ও ডলার সংকট এই পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। এসবের প্রভাবে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন ও রপ্তানি—সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক চাপ তৈরি হচ্ছে।
পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে ক্রয়াদেশে ক্রমশ পতন দেখা যাচ্ছে। স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোভন ইসলাম বলেন, এপ্রিল থেকে জুন সময়টি সাধারণত পোশাক খাতের জন্য ফল সিজন হিসেবে পরিচিত। এ সময়ে পণ্যের শিপমেন্ট চলে। তবে এবারের এই সময়ে ক্রয়াদেশ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অন্তত ৫ থেকে ৮ শতাংশ কম এসেছে।
সামনের দিনগুলোতে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উইন্টার বা হলিডে সিজন নিয়ে আরও বড় উদ্বেগ দেখা দিচ্ছে। এই সময়ের জন্য বর্তমানে ক্রয়াদেশ নিশ্চিত করার কাজ চলছে। তবে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ভোক্তা চাহিদা ব্যাপক কমেছে। ফলে এই মৌসুমে অন্তত ১০ শতাংশ পর্যন্ত ক্রয়াদেশ কমতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রেও এখন ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। সোভন ইসলাম আরও জানান, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো এখন মুনাফার চেয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখাকে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ফলে তারা দাম কমানোর জন্য ক্রমাগত চাপ দিচ্ছে। তবে উৎপাদন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় কারখানাগুলোর পক্ষে বড় ধরনের মূল্য ছাড় দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
দেশের রপ্তানি আয়ের সাম্প্রতিক তথ্যও বেশ উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে পোশাক রপ্তানি ৫ দশমিক ৫১ শতাংশ কমেছে। বিশেষ করে মার্চ মাসে রপ্তানি আয় প্রায় ৭৭ কোটি ডলার কমে যাওয়ার ফলে সামগ্রিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বর্তমান এই সংকটের মূল কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বৈশ্বিক ও দেশীয় উভয় দিক থেকেই চাপ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। এর ফলে পোশাক পরিবহনের খরচ ও লিড টাইম বেড়েছে। এতে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে যা সরাসরি উৎপাদন খরচের ওপর প্রভাব ফেলছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলো নতুন করে অর্ডার দেওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশের মতো রপ্তানিকারক দেশগুলো থেকে পোশাক সংগ্রহের পরিমাণ তারা কমিয়ে দিচ্ছে।
দেশের অভ্যন্তরেও সংকট কম নয়। ডলার ঘাটতি ও এলসি খোলার জটিলতার কারণে কাঁচামাল আমদানিতে নানা বাধা তৈরি হচ্ছে। এই সমস্যা পোশাকের উৎপাদন চক্রকে ধীর করে দিচ্ছে। এর পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে কারখানাগুলোতে নিয়মিত উৎপাদন কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
তৈরি পোশাক মালিক-রপ্তানিকারকদের সমিতি বিজিএমইএ’র সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ইনামুল হক খান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন ব্যয় ও লিড টাইম অনেকটা বেড়েছে। অন্যদিকে বৈশ্বিক বাজারে পোশাকের বিক্রি কমে যাওয়ায় ক্রেতারা অর্ডার দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক বেশি সতর্কতা অবলম্বন করছে। তার মতে, ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার এই প্রবণতা শুধু বাংলাদেশের নয় বরং প্রায় সব রপ্তানিকারক দেশের ক্ষেত্রেই ঘটছে।
বিজিএমইএ’র পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পোশাক খাতের প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার বকেয়া প্রণোদনা দ্রুত ছাড় করা প্রয়োজন। এটি না হলে অনেক কারখানার পক্ষে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। বর্তমানে ব্যাংক ঋণের সুদের হার এবং জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় কারখানাগুলোর নগদ অর্থ প্রবাহে তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, সাধারণত এপ্রিল মাসে নিট পোশাকের অর্ডার কম থাকে। কিন্তু এ বছর তা স্বাভাবিকের চেয়েও বেশি কমেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে এই প্রভাব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে পণ্য শিপমেন্ট হলেও সময়মতো পেমেন্ট পেতে দেরি হচ্ছে। তিনি জানান, তার নিজের প্রতিষ্ঠানেই প্রায় ৮ লাখ ডলারের পেমেন্ট বকেয়া রয়েছে।
বিজিএমইএ’র সহসভাপতি রেজোয়ান সেলিম জানান, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে কাঁচামাল আমদানির খরচ প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকটে কারখানার উৎপাদন ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে পোশাক শিল্পটি এখন একটি অত্যন্ত কঠিন সময় অতিক্রম করছে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত কেবল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান উৎস নয়। বরং এটি দেশের লাখো মানুষের কর্মসংস্থানের প্রধান ভিত্তি। উদ্যোক্তারা মনে করেন এই খাতের বর্তমান সংকট মোকাবিলা করা শুধু অর্থনৈতিক কারণে নয় বরং সামগ্রিক জাতীয় স্থিতিশীলতার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


