দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক সংকটে দিকনির্দেশনা দিতেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়াত উপাচার্য এমাজউদ্দীন আহমদ। গণতন্ত্রকে জাতির জীবন-কাঠি মনে করতেন তিনি। একটি দলের আদর্শের প্রতি তার সমর্থন থাকলেও, তিনি কখনো অন্ধ আনুগত্যের পর্যায়ে যাননি। বিনয়, দেশপ্রেম ও আত্মসন্মানবোধ তাকে অনন্য করে তুলেছে।
এমাজউদ্দীন আহমদের পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত স্মারক বক্তৃতায় তার সম্পর্কে এসব কথা বলেছেন বক্তারা। শনিবার রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করেছে এমাজউদ্দীন আহমদ রিসার্চ সেন্টার।
অনুষ্ঠানে অধ্যাপক আবদুল লতিফ মাসুমের সভাপতিত্বে মূল প্রবন্ধ উত্থাপন করে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য ও ইমেরিটাস অধ্যাপক এম শমসের আলী।
তিনি বলেন, ‘এরশাদবিরোধী আন্দোলন থেকে এক-এগারোর মতো কঠিন সময়েও, দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণে একজন বুদ্ধিজীবী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন এমাজউদ্দীন আহমদ। সামরিক শাসনের কুফল নিয়ে সরাসরি মন্তব্য করেছেন। দুই নেত্রী গ্রেপ্তার হওয়ার হওয়ার পর ঝুঁকি নিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন। পরবর্তীতে খালেদা জিয়ার বাসার সামনে বালুর ট্রাক দিয়ে ব্যারিকেড দেওয়ার ঘটনারও প্রতিবাদ করেছেন তিনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘গণতন্ত্রকে জাতির জীবন-কাঠি মনে করতেন এমাজউদ্দীন আহমদ। তিনি কোনো দলের অন্ধ আনুগত্য করেননি। অন্যায়কে অন্যায় বলেছেন সবসময়। জাতীয় সংকটে অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেছেন।’
এমাজউদ্দীন আহমদ রিসার্চ সেন্টারের পৃষ্ঠপোষক আবুল কাশেম হায়দার বলেন, ‘এখনো রাজনীতিবিদদের চরিত্রের পরিবর্তন হয়নি। আগে ছিল লুটপাট। এখন চলছে চাঁদাবাজি। এমনকি ছাত্ররা যে দল গঠন করেছে, তারাও পথভ্রষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়তে হবে। এজন্য এমাজউদ্দীন আহমদের রাষ্ট্রদর্শন থেকে শিক্ষা নিতে হবে।’
কিশোরগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘দেশের সব রাজনৈতিক সংকটে দিক নির্দেশনা দিয়েছেন এমাজউদ্দীন আহমদ। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া উনাকে খুব সন্মান করতেন। তিনি যেমন জ্ঞানসাধক ছিলেন, তেমনি একজন ভালো প্রশাসকও ছিলেন। কারো প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করতেন না তিনি। বিনয়ের কারণে তিনি অনন্য।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মামুন আল মোস্তফা বলেন, ‘একটা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সখ্য ছিল এমাজউদ্দীন আহমদের। তবে তিনি কখনো আনুগত্যের পর্যায়ে যাননি।’
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নজরুল ইসলাম বলেছেন, ‘বুদ্ধিজীবীদের উচিত রাষ্ট্রের ক্ষমতাবানদের উচ্ছিষ্ট খাওয়ার প্রবণতা থেকে বের হয়ে আসা। দল-মত নির্বিশেষে বুদ্ধিজীবীরা যদি অন্যায়ের সমালোচনা জারি রাখেন, তাহলে রাষ্ট্রব্যবস্থা চূড়ান্ত স্বৈরাচারী পর্যায়ে যেতে বাধাগ্রস্ত হবে। এমাজউদ্দীন আহমদ অন্যায়ের বিরুদ্ধে এই সমালোচনাটা জারি রেখেছিলেন।’
এমাজউদ্দীন আহমদের নাতনি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক বুশরা মাহজাবিন বলেন, ‘মনমানসিকতার দৃঢ়তা ও একইসঙ্গে সরলতা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। পারিবারিক জীবনেও তিনি ছিলেন অনন্য। দাদি অসুস্থ হলে তার হাত ধরে বসে থাকতেন।’
এমাজউদ্দীন আহমদের আরেকজন নাতনি ও এশিয়া ইন্টারন্যাশনাল কোয়ালিশন নামক একটি থিংট্যাঙ্কের কর্মকর্তা সাফকাত সিদ্দিকা বলেন, ‘তিনি ছিলেন লংটাইম লার্নার। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি বই পড়েছেন। তিনি কখনো কারো নামে দুর্নাম করেননি।’
অন্যান্যদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শ ম আলী রেজা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এ জি এম নিয়াজউদ্দিন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নঈম আক্তার সিদ্দিক, শেখ বোরহানউদ্দীন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজের শিক্ষক মাহবুবুর রহমান, এমাজউদ্দীন আহমদের মেয়ে ও বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য দিল রওশন জিন্নাত নাজনীন, এমাজউদ্দীন আহমদের ছেলে জিয়া হাসান প্রমুখ।


