রাজধানীর মিনিবাস চালক সাইদুল ইসলাম প্রতিদিন ১৭ ঘণ্টা স্টিয়ারিং ধরে থাকেন। তার নেই কোনো নির্দিষ্ট বেতন, নেই ছুটি। এমনকি অসুস্থ হলে বা দুর্ঘটনায় আহত হলেও তার পাশে দাঁড়ানোর কেউ নেই। সাতসকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ঢাকার ব্যস্ত রাস্তায় বাস চালান তিনি।
প্রতি বছর মে দিবসের মিছিলে অংশ নিলেও নিজের ভাগ্যের পরিবর্তন নিয়ে সন্দিহান এই চালক। সাইদুল ইসলাম টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘মে দিবসে আমাদের সামনে রেখে মিছিল করানো হয়, কিন্তু বছরের বাকি দিনগুলোতে আমাদের খোঁজ কেউ রাখে না।’
সাইদুল ইসলামের এই ক্ষোভ বাংলাদেশের বাণিজ্যিক পরিবহন খাতের একটি বড় চিত্র। এই খাতের চালক ও সহকারীদের কোনো ন্যূনতম মজুরি নেই। নেই নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা বা কোনো আনুষ্ঠানিক নিয়োগপত্র। তাদের আইনি সুরক্ষা অত্যন্ত সীমিত, অসুস্থতাজনিত ছুটিরও কোনো ব্যবস্থা নেই।
ঢাকার এক বাস সহকারী জানান, কখনো কখনো তাদের একটানা ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত ডিউটি করতে হয়। একটি ট্রিপ শেষ করে আসার পর মাঝখানে যে সামান্য সময় পাওয়া যায়, সেটুকুই তাদের ঘুমের সম্বল।
দেশে ঠিক কতজন পরিবহন শ্রমিক আছেন তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখ। এই হিসাব ধরে শিল্প সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এই খাতে শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৫০ লাখ হতে পারে, যা পোশাক খাতের চেয়েও বড়। এত বিশাল একটি খাত হওয়া সত্ত্বেও এটি মজুরি কাঠামোর বাইরে রয়ে গেছে।
ন্যূনতম মজুরি বোর্ড ৪৪টি খাতের মজুরি নির্ধারণ করলেও বাণিজ্যিক পরিবহন শ্রমিকদের জন্য কোনো কাঠামো তৈরি করেনি। ২০২০ সালে বেসরকারিভাবে নিয়োজিত কিছু পরিবহন শ্রমিকের জন্য ১০ হাজার ১০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা এখন একমাত্র রেফারেন্স হিসেবে কাজ করে। মজুরি বোর্ডের সচিব রাইশা আফরোজ জানান, পরিবহন শ্রমিকদের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ সরাসরি বোর্ডের কাছে পৌঁছায় না।
শ্রমিকদের আয় পুরোপুরি নির্ভর করে তারা কয়টি ট্রিপ দিতে পারলেন তার ওপর। সাইদুল ইসলাম জানান, নির্দিষ্ট বেতন না থাকায় বেশি ট্রিপ মানে বেশি আয়। কিন্তু অসুস্থ হলে আয় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
তিনি আরও জানান, দুর্ঘটনা ঘটলে মালিকরা দায় নিতে চান না। এমনকি পুলিশি মামলা হলে অনেক সময় নিজেদের পকেট থেকেই টাকা খরচ করতে হয়। এত কষ্টের মধ্যেও তারা মে দিবসের মিছিলে যান।
তবে মিরপুর-ফার্মগেট রুটের বাস সহকারী নাসিম হোসেন জানান, তিনি স্বেচ্ছায় মিছিলে যান না। রাজনৈতিক কর্মীরা এসে মিছিলে যেতে বাধ্য করেন, না গেলে পরে সমস্যায় পড়ার ভয় থাকে।
শত শত ইউনিয়ন, নেই শ্রমিক সুরক্ষা
সড়ক পরিবহন খাতে বিপুল সংখ্যক সংগঠন থাকলেও শ্রমিকদের মৌলিক অধিকারগুলো এখনো অরক্ষিত। শ্রম মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মালিক ও শ্রমিকদের মোট ৯৩২টি নিবন্ধিত সংগঠন রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন, যার অধীনে দেশজুড়ে ২৫৩টি ইউনিয়ন কাজ করে। অধিকাংশ পরিবহন সংগঠনই এই ফেডারেশনের ছত্রছায়ায় পরিচালিত হয়।
তবে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, এই সংগঠনগুলোর প্রভাব রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায়। সরকারি দলের অনুসারীরাই মূলত সংগঠনে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে।
এত সংগঠন থাকার পরও শ্রমিকদের দুর্দশা কেন কমছে না—এমন প্রশ্নে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান কাঠামোগত দুর্বলতার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, শ্রমিকদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ বা স্বাস্থ্য নিয়ে কেউ কাজ করে না। দুর্ঘটনা ঘটলে সবসময় চালককে দোষারোপ করা হয়, কিন্তু দুর্ঘটনা কমানোর জন্য কী প্রয়োজন তা নিয়ে কেউ ভাবছে না।
তবে শ্রমিকদের নামে সংগৃহীত ফান্ডের সঠিক ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে ফোনের সংযোগ কেটে দেন।
ফান্ডের টাকা কোথায় যায়?
সারা দেশে শত শত ইউনিয়নের নামে প্রতিদিন শ্রমিকদের কাছ থেকে টাকা তোলা হয়। তবে সেই টাকা কোথায় যায়, সে সম্পর্কে সাধারণ শ্রমিকদের ধারণা নেই। বছরের পর বছর ধরে গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে অভিযোগ উঠে, এই সংগৃহীত অর্থের ভাগ রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি, সিটি কর্পোরেশন এবং এমনকি প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার পকেটে যায়।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি আবদুর রহিম বক্স দুদু জানান, শ্রমিকরা সাধারণত ইউনিয়নকে প্রতিদিন ৩০ টাকা এবং ফেডারেশনকে ১০ টাকা করে চাঁদা দেন। এই টাকা কীভাবে ব্যবহার হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ফান্ডের টাকা সাংগঠনিক কাজে, শ্রমিক নেতাদের সম্মানী এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়ে খরচ করা হয়।
নাগালের বাইরে সরকারি সহায়তা
সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, শ্রমিকদের সহায়তার জন্য বিভিন্ন সরকারি তহবিল রয়েছে। এখান থেকে চিকিৎসা সহায়তা এবং দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু বা পঙ্গুত্বের জন্য ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সুযোগ আছে। বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের সহকারী পরিচালক তাসনোভা আহমেদ অনন্যা জানান, যথাযথ আবেদনের মাধ্যমে এই সুবিধা পাওয়া সম্ভব।
তবে সাধারণ শ্রমিকদের কাছে এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল। মহাখালী টার্মিনালের বাস সহকারী আলমগীর হোসেন জানান, তিনি কীভাবে আবেদন করবেন বা কোথায় যাবেন এবং কী কী কাগজ লাগবে তা কেউ তাকে বুঝিয়ে বলেনি।
গাজীপুর-ঢাকা রুটের চালক হুমায়ুন কবির অভিযোগ করেন, আবেদনের জন্য অনেক কাগজপত্র লাগে। বারবার বিভিন্ন অফিসে দৌড়াতে হয়, যা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। মিরপুর রুটের সহকারী মো. রাশেদ জানান, অক্ষরজ্ঞান না থাকায় ফরম পূরণ বা আবেদনপত্র লেখা তাদের জন্য অনেক কঠিন, তাই তারা আর সহায়তার চেষ্টা করেন না।


