পুরান ঢাকার সরু গলিগুলোতে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী নানা রকম শিল্পের সমারোহ। যেখানে হাতুড়ির ঠোকাঠুকি আর যন্ত্রপাতির গুঞ্জনে মুখরিত থাকে চারপাশ, সেখানেই লুকিয়ে আছে এক অন্ধকার বাস্তবতা। ধাতু শিল্প, চামড়ার কাজ কিংবা বই বাঁধাইয়ের মতো যে শিল্পগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই এলাকাকে পরিচিতি দিয়েছে, তার অনেকটাই টিকে আছে শিশুদের ঘাড়ে ভর করে। যেসব শিশুর এখন স্কুলে থাকার কথা, তারা আজ ধোঁয়ায় ঘেরা কলকারখানায় হাড়ভাঙা খাটুনি খাটছে।
কামরাঙ্গীরচরের একটি ছোট জুতার কারখানায় ধুলোবালি আর চামড়ার কটু গন্ধের মধ্যে ১৪ বছরের এক কিশোরকে নিরলস কাজ করতে দেখা যায়। তার হাত কাজে বেশ দক্ষ হয়ে উঠলেও চোখে নেই কোনো চঞ্চলতা বা শৈশবের সারল্য। এই বয়সে তার শ্রেণিকক্ষে পাঠ নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সে এখন শহরের ঐতিহ্যবাহী শিল্প টিকিয়ে রাখা শিশুশ্রমের এক অংশ। অন্যদের মতো সে-ও খুব সামান্য মজুরিতে দীর্ঘ সময় কাজ করে। কারখানার এই চার দেয়ালের বাইরে তার ভবিষ্যতের আর কোনো স্বপ্ন নেই।
ঐতিহ্যের মূল্য যখন শৈশব
পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি রাস্তায় আজও প্রাচীন ব্যবসার প্রতিধ্বনি শোনা যায়। ধাতু শিল্পের সূক্ষ্ম কারুকাজ থেকে শুরু করে বই বাঁধাইয়ের নিপুণ শিল্প—সবই আছে এখানে। কিন্তু এক সময় যা শহরের গর্ব ছিল, আজ তা শিশুশ্রম শোষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
কামরাঙ্গীরচরের একটি জুতার কারখানায় কাজ করে ১৫ বছরের ফরহাদ, ১২ বছরের নীরব এবং ১৪ বছরের ফুয়াদ। তাদের পরিবার নোয়াখালীর গ্রাম থেকে আসা। এই শিশুদের সামান্য আয়ের ওপরই তাদের সংসার চলে।
ফরহাদ পঞ্চম শ্রেণির পর আর স্কুলে যায়নি। সে জানায়, গত কয়েক বছরে সে পাঠ্যবই চোখেও দেখেনি। এখন চামড়া, সুঁই আর হাতুড়ির শব্দই তার জগত। কপাল থেকে ঘাম মুছতে মুছতে ফরহাদ বলে, তার পড়ার সময় নেই। সে কাজ না করলে বাড়িতে টাকা পাঠাবে কীভাবে—এমন প্রশ্নই এখন তার বাস্তবতা।
পুরান ঢাকার শিল্পাঞ্চলে এটি একটি অতি পরিচিত দৃশ্য। দারিদ্র্য শিশুদের এমন সব কাজে ঠেলে দিচ্ছে যা তাদের শৈশব ও শিক্ষা দুই-ই কেড়ে নিচ্ছে।
কেন কাজ করে শিশুরা
শিশুদের শ্রমে যুক্ত হওয়ার কারণটি খুব সহজ—তা হলো চরম দারিদ্র্য এবং পরিবারকে সহায়তা করার তাগিদ। সূত্রাপুর, বাংলাবাজার, লালবাগ এবং চকবাজারের মতো এলাকায় শিশুরা বিভিন্ন পেশায় জড়িয়ে আছে।
রায়সাহেব বাজারের বই বাঁধাইয়ের দোকানে কাজ করে ১৩ বছরের মোহাম্মদ হাসান। আবার লালবাগের বেকারিতে কাজ করে ১১ বছরের তুহিন ও ১২ বছরের তুষার। এদের অধিকাংশকেই আয়ের খোঁজে গ্রাম থেকে শহরে আনা হয়েছে। হাসান খুব অল্প বয়সে বাবা-মাকে হারিয়েছে। গত দুই বছর ধরে সে ভাইবোনদের সাহায্য করার জন্য কাজ করছে। হাসান জানায়, কাজ না করলে সে বাড়িতে টাকা পাঠাতে পারবে না। তাই তার পড়াশোনার কোনো সুযোগ নেই।
স্বাস্থ্যের ওপর ঝুঁকি
এই কাজের ফলে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। অস্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশে শিশুরা বিষাক্ত ধোঁয়া ও বিপজ্জনক যন্ত্রপাতির সঙ্গে কাজ করছে। ফলে সবসময়ই দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকছে। ধাতু কারখানায় উচ্চ তাপমাত্রা ও ধারালো যন্ত্রপাতির ব্যবহার শিশুদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। একইভাবে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ কারখানায় আগুনের শিখা ও গরম তেল থেকে পুড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। বেশিরভাগ কারখানায় নিরাপত্তা সরঞ্জামের অভাব এই বিপদকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
শারীরিক ঝুঁকির পাশাপাশি মানসিক চাপও শিশুদের জন্য উদ্বেগের বিষয়। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, পর্যাপ্ত বিরতির অভাব এবং বিনোদনের কোনো সুযোগ না থাকায় তাদের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। চকবাজারের কাছে পিতলের কারখানায় কর্মরত ১২ বছরের এক শিশু জানায়, সে মূলত কাজ শিখতে এসেছিল। কিন্তু এখন তাকে সারাক্ষণ কাজ করতে হয়। তার আর স্কুলে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
লাভের জন্য শোষণ
শিশুশ্রমের এই শোষণ কোনো গোপন বিষয় নয়। অনেক কারখানার মালিক প্রকাশ্যে স্বীকার করেন, কম মজুরিতে পাওয়া যায় বলে তারা শিশুদের নিয়োগ দেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কারিগর জানান, কাজ শিখতে আগ্রহী অল্পবয়সী শ্রমিকের অভাব নেই। তারা অনেক কম টাকায় কাজ করতে রাজি হয়। রায়সাহেব বাজারের নাট-বল্টু কারখানা কিংবা সূত্রাপুর ও বংশালের মোটরসাইকেল গ্যারেজে অনেক শিশুকে ‘শিক্ষানবিশ’ হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু বাস্তবে তারা প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকদের মতোই পূর্ণ সময় কাজ করে।
আইন ও বাস্তবতার ব্যবধান
বাংলাদেশে ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের কাজ করানো আইনত নিষিদ্ধ। এমনকি ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কাজও সীমিত করা হয়েছে। তবে আইনের প্রয়োগ এখানে অত্যন্ত দুর্বল।
বাংলাদেশ শিশু অধিকার কমিশনের চেয়ারপারসন শাহ ইসমত আজমেরী উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, অনেক কারখানায় শিশুদের দিয়ে বিপজ্জনক কাজ করানো হচ্ছে। কর্তৃপক্ষের কার্যকর নজরদারির অভাবে এই শিশুরা ক্রমাগত কষ্টের শিকার হচ্ছে।
সরকার এই সমস্যা সমাধানে কিছু পদক্ষেপ নিলেও দারিদ্র্য এবং সস্তা শ্রমের চাহিদার কারণে শিশুশ্রম বন্ধ হচ্ছে না। বিষয়টি অত্যন্ত জটিল। তবে এটি স্পষ্ট যে, সরকার, ব্যবসায়ী এবং সমাজের সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া এই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের অধিকার রক্ষা করা সম্ভব নয়। তাদের শৈশব ফিরিয়ে দিতে এবং শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।


