কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ও আদালতের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ আদায় সহজ করতে প্রয়োজনে আন্দোলনের কথা বললেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর।
তিনি বলেন, ‘সংশোধিত বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার ও অর্থ ঋণ আদালত আইন অধ্যাদেশ হিসেবে জারির মাধ্যমে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনে আন্দোলন করতে হবে।’
বৃহস্পতিবার রাজধানীর পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত ‘ব্যাংকিং সেক্টর রিফর্ম: চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড ওয়ে ফরওয়ার্ড’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন গভর্নর।
এ সময় তিনি ব্যাংক খাত সম্পর্কিত বেশি কয়েকটি আইন আলোর মুখ না দেখায় আমলাতন্ত্রের প্রতি প্রচ্ছন্ন হতাশাও ব্যক্ত করেন। তার গোটা বক্তব্যে অন্তত তিনবার আসে আন্দোলনের কথা।
আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে। তাই এই আইনটা খুব প্রয়োজন। বর্তমান সরকারের সময়েই এই আইনের অধ্যাদেশ জারি করে বাস্তবায়ন করতে হবে।’
‘কোনো ধরনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতার মাধ্যমে আইনটি আটকিয়ে দেওয়া উচিত হবে না। এটা নিয়ে দরকার হলে আমাদেরকে আন্দোলনও করতে হবে। অন্তবর্তী সরকার যেন গর্ব করতে পারে, বাংলাদেশ ব্যাংককে তারা স্বাধীন করে দিয়ে গেছে। এই সুযোগটা তাদের হারানো উচিত হবে বলে মনে হয় না।’
সংশোধিত অর্থ ঋণ আদালত আইন বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, ‘খেলাপি ঋণ কোনোদিনই কমবে না যদি আমরা কার্যকর অর্থ ঋণ আদালত আইন তৈরি করতে না পারি। কাজেই এটাকে নিয়ে আমাদের একটা আন্দোলনও করতে হবে। এটা সমাজের চাহিদা। বিচার বিভাগকে এই চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার বাস্তবায়ন না হওয়া নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যে বিরাজমান হতাশার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে গভর্নর বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার আইনে পরিণত করার প্রক্রিয়া যত দেরি হবে, ততই হতাশা সৃষ্টি হয়। তবে আমি আশা করি, এই সরকারের জন্য একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত হবে, যদি সরকার করে। আমি আশাবাদী সরকার হয়তো করবে শেষ পর্যন্ত। দেখা যাক।’
পরিস্থিতি হালকা করতে হতাশামিশ্রিত হাসি দিয়ে মনসুর বলেন, ‘আশাতো ছাড়তে হয় না, তাই না? আশা ছাড়লে তো চলবে না।’
গভর্নর বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারসহ ব্যাংক কোম্পানি আইন, অর্থ ঋণ আদালত আইন প্রস্তুত করে সরকারের কাছে আমরা জমা দিয়েছি। এছাড়া দেউলিয়া বিষয়ক আইন ও অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি আইন তৈরি করা হচ্ছে। বর্তমান সরকার এগুলো বাস্তবায়ন করলে এই যাত্রায় আর্থিক খাতের সংস্কার মোটামুটি একটি পর্যায়ে যাবে।’
সেমিনারে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘‘আসন্ন নির্বাচন একটি সন্ধিক্ষণ। রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ব্যাংকিং খাতকে কীভাবে সুশৃঙ্খল ও শক্তিশালী করা হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ ও সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি থাকতে হবে।’
‘রাজনৈতিক নেতাদের স্পষ্ট করতে হবে যে তারা কি আগের মতো ক্ষমতাশালী পুঁজিপতিদের হাতে ব্যাংকিং খাতকে ব্যবহার করতে দেবেন। একটি পুঁজিপতির হাত থেকে ব্যাংক খাত আরেক পুঁজিপতিদের কাছে যাবে, না কি জনগণের কল্যাণে, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের পুঁজি জোগানের জন্য এই খাতকে ব্যবহার করবেন।’
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও বেসরকারি মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘‘২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংক দখলের মাধ্যমে ব্যাংক খাত ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। এ জন্য এখন খেলাপি ঋণ ৩৬ শতাংশ পৌঁছে গেছে। এখন যে সংস্কার হচ্ছে, তা রাজনৈতিক সরকার কতটা এগিয়ে নেবে; তা গুরুত্বপূর্ণ।’
সেমিনারে গভর্নর জানান, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও আস্থা ফেরাতে ২০ কোটি টাকার উপরে নেওয়া প্রতিটি ঋণ সরেজমিন যাচাই করতে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, ‘ব্যাংকিং খাতে সুশাসন আনতে, গ্রাহকদের আস্থা ফেরাতে ঋণগুলো সঠিক ল্যান্ডিং করেছে কি, না তা রেগুলারভাবে দেখা হবে। এজন্য ৫০০ জনের একটি টিম গঠন করা হয়েছে, যার মধ্যে ফরেনসিক অডিট করতে পারে এমন ৫০ জনকে ট্রেনিং দেওয়া হচ্ছে। ব্যাংকিং খাতে বাংলাদেশে ফরেনসিক অডিট নেই। ফরেনসিক অডিটের সক্ষমতা না থাকলে চুরি-চামারি ধরা যাবে না।’
সুশাসন ও গ্রাহক আস্থা ফেরাতে ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় জামানত রাখা হচ্ছে কি না, তা দেখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই টিম কাজ করবে জানিয়ে গভর্নর বলেন, ‘২০ কোটি টাকার বেশি সব ঋণ নতুন করে যাচাই করা হবে। এসব ঋণের জামানত ঠিক আছে কি না, তা দেখা হবে। না থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ব্যাংক পরিচালকদের জবাবদিহি করতে হবে।’
ঋণ কেলেঙ্কারি, অর্থপাচারে সহায়তা ও ব্যাংকিং খাতের অনিয়মে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দায় রয়েছে কতটা এবং তাদের শাস্তির বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে তা জানতে চাইলে আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘‘সেক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) পুরো ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আমরা কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ বা বাধা দেবো না। বাংলাদেশ ব্যাংকের যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।’
‘দুদক এ বিষয়ে কাজ করছে। আমি আর বেশি বলবো না। তারা ঋণ বিতরণের কাদের কাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে তা দেখছে।’
নতুন করে আর কোনো ব্যাংক একীভূত করার পরিকল্পনা নেই জানিয়ে গভর্নর বলেছেন, সমস্যায় থাকা ৯ আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়ন করা হবে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংকসহ যেকোনো দাতা সংস্থার ধারের অর্থ ছাড়াই চলতি বছর শেষে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন ডলারের পৌঁছানোর লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
খেলাপী ঋণের হারে বর্তমানে বিশ্বে বাংলাদেশ সবার ওপরে জানিয়ে গভর্নর বলেন, ‘‘অনেক ব্যাংকে মূলধন ঘাটতি রয়েছে এবং খেলাপি ঋণের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। আমার ধারণা ছিল খেলাপি ঋণ ২৫ থেকে ২৭ শতাংশ হবে, কিন্তু বাস্তবে তা প্রায় ৩৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।’
নিজস্ব কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির সভাপতি দৌলত আকতার মালা ও অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম।


