বাংলাদেশে কারাবন্দী সাংবাদিকদের বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের ‘জরুরি মনোযোগ আকর্ষণ’ করেছে কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)।
সোমবার সিপিজের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের মহাপরিচালক বেহ লি ই’র সই করা এক চিঠিতে এই আহ্বান জানানো হয়।
স্বাধীন ও অলাভজনক সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বিষয়ক সংস্থাটি বুধবার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসের ঠিক আগের দিন এই চিঠি দিল।
বিভিন্ন স্থান থেকে পাওয়া তথ্যের সন্নিবেশ ঘটিয়ে সিপিজে ওই চিঠিতে বলেছে, বর্তমানে বাংলাদেশে চারজন সাংবাদিক হত্যার মামলা কারাগারে বন্দী রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে সেগুলোতে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ নেই। তাই ধারণা করা হচ্ছে, এই সাংবাদিকদের প্রতিবেদন ও অনুমিত রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার প্রতিশোধ হিসেবেই তাদের এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে।
সাংবাদিকরা কীভাবে কাশিমপুর কারাগারে বাস করছেন সে পরিস্থিতির বর্ণনা সিপিজে পেয়েছে তাদের পরিবারের সদস্যদের কাছে। তারা বলছেন, সাংবাদিকদের রাখা হয়েছে ৩৬ বর্গফুট আয়তেনের লোহার শিকযুক্ত দরজা সম্বলিত ছোট সেলে। ফলে তারা ঠান্ডায় যেমন কষ্ট পাচ্ছেন তেমনি মশার উপদ্রবও রয়েছে।
কারাগার থেকে যে খাবার সরবরাহ করা হয় তাকে অপর্যাপ্ত এবং প্রায়শই খাওয়ার অযোগ্য বলেও পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। এসব পরিস্থিতি গুরুতর মানবাধিকার উদ্বেগ বাড়াচ্ছে বলে মনে করে সিপিজে।
বন্দী সাংবাদিকরা যথাযথ চিকিৎসা পরিষেবা পান না, কারাগারে কোনো স্থায়ী চিকিৎসক নেই, রুটিন পরীক্ষা করানো অসম্ভব, পরিবার সরবরাহ না করলে বন্দীরা কোনো ওষুধ পান না বলেও চিঠিতে উল্লেখ করেছে সিপিজে।
বন্দীদের মধ্যে ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং স্লিপ অ্যাপনিয়ার রোগী থাকলে মাস পেরিয়ে গেলেও চিকিৎসা পাননি বলেও পরিবারের বরাত দিয়ে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
দ্য ডেইলি স্টারকে গত বছরের নভেম্বরে দেওয়া প্রধান উপদেষ্টার এক সাক্ষাৎকারের প্রসঙ্গ টেনে সিপিজে চিঠিতে বলেছে, ‘আপনি সেসময় বলেছিলেন যে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যাচাইবাছাই ছাড়াই হত্যা মামলা হচ্ছে। একই সাক্ষাৎকারে আপনি বলেছিলেন যে, আপনার সরকার এই ধরনের পদক্ষেপ বন্ধ করেছে এবং এসব মামলা পর্যালোচনার জন্য একটি কমিটিও গঠন করেছে।’
‘তবে গত বছরের ৮ আগস্ট আপনি দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশে কারাবন্দী চার সাংবাদিকের বিরুদ্ধে নতুন করে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। এরা হলেন ফারজানা রুপা, শাকিল আহমেদ, মোজাম্মেল বাবু এবং শ্যামল দত্ত। বারবার তাদের জামিন নামঞ্জুর করা হয়েছে।’
এই সাংবাদিকদের মধ্যে কয়েকজনের প্রতিনিধিত্বকারী আইনজীবী জেড আই খান পান্নার বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ তোলা হচ্ছে, বলেও সেখানে উল্লেখ করা হয়।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ এবং আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার চুক্তি অনুযায়ী বাকস্বাধীনতা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষার প্রসঙ্গ টেনে সিপিজে বলছে, ‘বিচার বিভাগও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং জবাবদিহিতা জোরদার করার ক্ষেত্রে একটি স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বারবার স্বীকৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশকে অবশ্যই দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বাধ্যবাধকতা বজায় রাখতে হবে।’
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস সামনে রেখে প্রধান উপদেষ্টাকে এমন পদক্ষেপ নিতে সিপিজে অনুরোধ জানিয়েছে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশে কারাবন্দী সব সাংবাদিক তাদের পরিবারের কাছে ফিরে যেতে এবং কাজে যোগ দিতে পারবেন।
সিপিজে মনে করে, প্রকৃত সংস্কারের জন্য অতীতের অপব্যবহারের পুনরাবৃত্তি নয় বরং অতীতের চর্চা থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার জন্য দেশ প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ সময়ে এসে সকল রাজনৈতিক দলের জন্যই সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া উচিত।
সিপিজের মাধ্যমে বিশ্বের দেড় হাজারের বেশি সাংবাদিক বিশ্বজুড়ে সরকারগুলোর প্রতি কারাবন্দী সাংবাদিকদের মুক্তি দেওয়া এবং সংবাদমাধ্যমের ওপর আক্রমণ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
সিপিজে বলছে, এই বিষয়ে মুহাম্মদ ইউনূস ব্যক্তিগতভাবে মনোযোগ দিলে তা বাংলাদেশে মানবাধিকার, ন্যায়বিচার এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতিকেই তুলে ধরবে।
প্রধান উপদেষ্টার কাছ থেকে এই চিঠির জবাবের অপেক্ষায় থাকবে বলেও জানিয়েছে সিপিজে।
বুধবার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস
এ বছর ‘আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস’ এর প্রতিপাদ্য ‘হিউম্যান রাইটস: আওয়ার এভরিডে এসেনসিয়ালস’।
গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা বলছে, ব্যক্তির আইনগত পরিচয় মানবাধিকার সুরক্ষার অন্যতম মৌলিক স্তম্ভ। কেবল জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন নিশিচতকরণের মাধ্যমে এই অধিকার সুরক্ষা সম্ভব। নিবন্ধনহীন ব্যক্তি রাষ্ট্রের চোখে অদৃশ্য এবং মৌলিক সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
বর্তমানে বাংলাদেশে জন্ম নিবন্ধনের গড় হার ৫০ শতাংশ অর্থাৎ এখনো অর্ধেক মানুষকে নিবন্ধন না থাকার কারণে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক অধিকার পেতে বেগ পেতে হচ্ছে। নিবন্ধনহীনতা দেশে শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, মানবপাচারসহ বিভিন্ন ধরনের মানবধিকার লঙ্ঘনকে ত্বরান্বিত করছে। একইভাবে, মৃত্যু নিবন্ধন না থাকায় উত্তরাধিকার প্রমাণে জটিলতা সৃষ্টি হয়। আত্মীয়দের মধ্যে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের ঝুঁকি সৃষ্টি হয়। বর্তমানে দেশে অর্ধেকেরও বেশি মানুষের মৃত্যু নিবন্ধন নেই। বিশেষ করে গ্রাম, চরাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা ও নগরের বস্তি এলাকায় এই হার অনেক কম।
প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের বলেন, ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন শুরু হয় পরিচয়হীনতা থেকে। আইন সংস্কারের মাধ্যমে নিবন্ধন কার্যক্রম জনবান্ধব করতে হবে, যাতে কোনো মানুষই পরিচয়হীন না থাকে এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আইনি সুরক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিসহ সকল মৌলিক অধিকার সমানভাবে ভোগ করতে পারে।’


