জুবায়ের তানিন, আবু ধাবি থেকে
দাঁড়িয়ে ছিলাম দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনের লাইনে। বেশ দীর্ঘ লাইনই বটে, ফিতা টেনে আঁকাবাঁকা করে একদম কাউন্টার পর্যন্ত ঠেকেছে। কয়েকটা ফ্লাইট মিলিয়ে আমি-সহ শ-পাঁচেক ভিনদেশি যারা প্রথমবার দুবাই এসেছেন, তাদের জন্যই এত আয়োজন। অবশ্য মিনিট পাঁচেকের মধ্যে কাউন্টারে পৌঁছে গিয়েছিলাম, প্রক্রিয়া বেশ দ্রুত থাকায়। রেটিনা স্ক্যান করে, ফ্রি ট্যুরিস্ট সিম নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার আগে ভিন্ন জাতীয়তা, বর্ণ, ভাষা, রঙ-এর মানুষদের দেখছিলাম অবাক চোখে। প্রথমবার মাতৃভূমি ছেড়ে অন্য কোথাও এলাম কিনা!
কেমন অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছিল। ঠিক বলে বা লিখে বোঝানোর মতো নয় জিনিসটা। ইমিগ্রেশনের লাইনে আমার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক ফরাসি ভদ্রমহিলা। কী করে বুঝলাম? হাতে ধরা মেরুন রঙের পাসপোর্টে (Union europeenne Republique Francaise Passeport) লেখা দেখে। পেছনের নারীর বয়স আন্দাজ করা যায়নি, বোঝাও যায়নি কী বলছেন। কোরিয়ান বা জাপানিজ কেউ হবেন হয়তো। আঁকাবাঁকা ফিতা দিয়ে বানানো লেনগুলোতে আমার হাতের ডানদিকেই ছিল একটা মরক্কান পরিবার।
হ্যাঁ, এবারও ঠিকই ধরেছেন! তাদের হাতে থাকা পাসপোর্টের লেখা দেখেই বুঝেছি তারা জাতীয়তায় মরক্কান। অবশ্য প্রথমবার তাকিয়ে বেশ অবাকই হয়েছিলাম, তাদের পাসপোর্টের কভারটাও আমাদের মতো সবুজ কিনা!
এতটুকু পড়ে ‘ধান ভানতে শিবের গীত’ মনে করলে করতেও পারেন আপনি। তবে ওপরের অনুচ্ছেদ তিনটি অবতারণার একটাই লক্ষ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত বিশেষত দুবাই যে কেবল আর আরবদের নেই, মাল্টিকালচারাল, স্কাইস্ক্র্যাপার, মাল্টি লিঙ্গুয়াল, বৈচিত্র্যময় এক শহরে পরিণত হয়েছে, সেটারই সামগ্রিক একটা ধারণা দেয়া। পৃথিবীর সব মহাদেশ থেকেই কাউকে না কাউকে আপনি পাবেন এখানে। দেখে হয়তো বুঝতে পারবেন না, কে কোথাকার নাগরিক। তবে আমার মতো পাসপোর্ট দেখার চোখ থাকলে ভিন্ন কথা! (রাগ করবেন না প্লিজ)
দুবাইয়ের গল্প আরেকদিনের জন্য তোলা রইল। যেহেতু ঘণ্টা দুয়েকের বেশি থাকা হয়নি বুর্জ খলিফার শহরে। এশিয়া কাপ কভার করতে এসে ঘাঁটি গাঁড়তে হলো রাজধানী আবু ধাবিতে। বাংলাদেশ দলের গ্রুপ পর্বের সবগুলো ম্যাচ এখানেই কিনা। খেলবে হংকং, আফগানিস্তান আর শ্রীলংকার বিপক্ষে। প্রথম ম্যাচের আগে দুদিন যাওয়া হয়েছে শেখ জায়েদ স্টেডিয়ামে। এই দুইদিনে ট্যাক্সি করে হোটেল থেকে মাঠে আসা-যাওয়ার পথে, প্র্যাক্টিস গ্রাউন্ডে, চায়ের দোকানে, রেস্তোরায় ভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের সাথে আলাপ হয়েছে, পরিচয় হয়েছে।
এদের মধ্যে একজন নেপালি ট্যাক্সি ড্রাইভার ভুষণ কুমার। সালাম স্ট্রিটের কিংসগেট হোটেলের সামনে যার সাথে পরিচয়। রাইড শেয়ারিং প্লাটফর্ম ‘ইয়াঙ্গু’ (Yango) তে গাড়ি চালান। বেশ হাসিখুশি, বাকপটু লোক। কথায় কথায় জানা গেল, নেপালের ‘জেনারেশন-জেড’ আন্দোলনের পর ভেতরে ভেতরে বেশ ফুঁসছেন তিনি। সরকারের পতন হয়েছে, বড় নেতারা পালিয়েছেন। তার ধারণা কেউ কেউ পালিয়ে আরব আমিরাতেও আসবেন। তখন তাদের হাতের কাছে পেলে, একটা ‘প্রতিশোধ’ নেয়ারও অঘোষিত প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাখলেন আমাদের। অবশ্য নেপালি টানের হিন্দি আর ইংরেজি মিলিয়ে যা যা বলেছেন, তা মনে করতে পারাও একটা বড় ব্যাপারই বটে!

গন্তব্য ছিল শেখ জায়েদ স্টেডিয়াম। উদ্দেশ্য, বাংলাদেশ দলের অনুশীলন দেখা আর লিটন দাসের সংবাদ সম্মেলন কভার করা। কিন্তু ক্রিকেট ভুলে তখন আবুধাবির জ্যাম, ট্রাফিক সিগনাল, এখানকার মানুষের লাইফস্টাইল নিয়ে চলছে তুমুল আলোচনা। তার কথাতেই উঠে এলো দুবাই আর আবু ধাবি আর দুবাইয়ের পার্থক্য। এই তুলনার রসদ অবশ্য যুগিয়েছে আল সাদ্দা স্ট্রিটে দাঁড়িয়ে থাকা ‘পাইন-অ্যাপল টাওয়ার’ খ্যাত আল-বাহার টাওয়ার। আনারসের মতোই গঠনশৈলী, অতিরিক্ত গরম পড়লে ভবনের বাইরে গায়ে লেগে থাকা বিশেষায়িত ছাতাগুলো নিজে থেকেই খুলে যায়। আরবদের রুচিশীল স্থাপত্যশিল্পর দারুণ একটা উদাহরণও।

মুগ্ধতা প্রকাশ করতে না করতেই ভূষণ মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললেন, ‘আবু ধাবি তো দুবাইয়ের তুলনায় গ্রাম’
বলে কী এই লোক! রাজধানীকে বলছে গ্রাম!? পাল্টা প্রশ্ন করতেই দুবাইতে গিয়ে সব মিলিয়ে নেয়ার সাজেশন দিয়ে রাখলেন। অবশ্য আরব আমিরাতের আসল গ্রাম দেখতে আসলে কেমন, সেটার জন্য এরপর বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি।
জায়েদ স্পোর্টস সিটির কিলো পাঁচেক আগে পড়বে আর ফুরসান। এত সাজানো-গোছানো একটা আবাসিক এলাকা, ডুপ্লেক্স-ট্রিপলেক্স বিল্ডিংয়ের ছড়াছড়ি, আছে বেশ কয়টা ফাইভ স্টার হোটেলও। তবুও নাকি এটা গ্রাম! বিশ্বাস করতে একটু কষ্টই হলো। নিজের চোখে না দেখলে নির্ঘাত অবিশ্বাস করে বসতাম। তবে এখানকার বাসিন্দা, স্থানীয় আরবদের নিয়ে ভূষণ খুব একটা খুশি না। যারা কিনা ‘হার্টলেস’। অবশ্য গ্রাম হলেও এখানে থাকতে হলে গুনতে হয় কমপক্ষে ১৫০০ দিরহাম প্রতি রাতে। মধ্যবিত্ত বাঙালি মন তখন বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ কত হয়, সেই হিসেব কষতে ব্যস্ত।

ভুষণের সাথে আলাপচারিতায় ইতি টানা যাক এবার। ক্রিকেট কভার করতে এসেছি, ক্রিকেটের গল্প না করলে পোষাবে? তবে পাঠক, আরব আমিরাতের লোকজন ক্রিকেট নিয়ে সেই অর্থে আমাদের মতো প্যাশনেট নয়। অনেকেই জানে না, আবু ধাবিতে এশিয়া কাপ শুরু হয়েছে।
মোবাইলের সিম কিনতে গিয়েছিলাম আবু ধাবি মলে। এটিসালাত- এর শো রুমে যে ভারতীয় সেলস গার্ল ছিলেন, পাসপোর্ট দেখে জিজ্ঞেস করলেন কেন এসেছি। বললাম, এশিয়া কাপের জন্য। ‘এশিয়া কাপ এবার এখানে!?’, বুঝুন অবস্থা।
এই দলে থাকা আরো একজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি। পাকিস্তানি ট্যাক্সি ড্রাইভার আব্বাস খান। বছর দশেক ধরে আবু ধাবিতে থাকেন, খাইবার পাখতুন-খাওয়ার কোহাট গ্রামে বাড়ি। ছুটিছাটায় সেখানে যান বছর দুয়েক পরপর পরিবারের কাছে। আব্বাসের ট্যাক্সি করেই ফিরছিলাম জায়েদ স্টেডিয়াম থেকে হোটেলে। বাংলাদেশি ক্রীড়া সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে জানতে চাইলেন কেন এসেছি এই গরমে? আবারও এশিয়া কাপ, ম্যাচ কভার করতে চাওয়ার বাসনা, সবই বলতে হলো যতটা সংক্ষেপে সম্ভব। কথা শেষ করতে না করতেই পর সেই সেলস গার্লের মতোই অবাক চেহারার দেখা মিলল।

তবে ক্রিকেটের সাথে অল্পবিস্তর পরিচয় তার আছে। আছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা এক পাকিস্তানি পেসারের সাথে বন্ধুত্বও। আকিফ জাভেদ, বাঁহাতি পেসার। বিপিএলে খেলে গেছেন রংপুর রাইডার্সের হয়ে। তথ্যটা পেতেই আব্বাসের চেহারায় ফুটে উঠল হাসি। দুজনের বাড়িই খাইবার প্রদেশের একইগ্রামে, এক কিলো রেডিয়াসেই বসবাস। ছোট একটা একাডেমি আছে, সেখানেই আকিফের সাথে গড়ে উঠেছে আব্বাসের বন্ধুত্ব। তবে সময়ের সাথে দুদিকে বেঁকে গেছে দুজনার পথ। আকিফ মাটি খুঁযে পেয়েছেন ক্রিকেট বল হাতে, আব্বাসকে তুলে নিতে হয়েছে বিদেশ বিভূঁইয়ে গাড়ির স্টিয়ারিং।
মধ্য প্রাচ্যের এই দেশের আলো ঝলমলে জীবনে ক্রিকেটের জায়গা খুব একটা নেই। খেটে খাওয়া মানুষগুলোকে অবশ্য আমরা দেখি না, তারা আড়ালেই থাকেন। পেটের ক্ষুধায় ছুটে চলা মানুষগুলো দরদরিয়ে ঘামেন, তবুও থামার নাম নেই। নিজে দুটো কম খেয়ে-কম পরে, পরিবারের জন্য কটা দিরহাম বেশি কামানো যেখানে এই মেহনতি মানুষগুলোর জীবনের উদ্দেশ্য, সেখানে ক্রিকেট নিয়ে কথা বলাটাও বিলাসিতা।
অবশ্য আব্বাস বেশ খুশি মনেই কথা বলেছেন, পুরনো স্মৃতিচারণ করে হালকাও হলেন। আবার তার সাথে দেখা হবে কিনা কে জানে, তবে দেখা হলে ‘কাড়াক-চা’ খাওয়াবেন বলে কথা দিয়েছেন।


