প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো পাবনা পৌরসভার অবস্থা এখন শোচনীয়। এক যুগেরও বেশি সময় আগে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা জরাজীর্ণ ভবনে চলছে পৌরসভার দাপ্তরিক কার্যক্রম। ফলে যেকোনো সময় ঘটতে পারে বড় ধরণের দুর্ঘটনা। এরপরও নতুন ভবন নির্মাণের কোনো উদ্যোগ নেই।
১৮৭৬ সালে তৈরি হওয়া এই পৌরসভা ১৯৮৯ সালে প্রথম শ্রেণির মর্যাদা পায়। কিন্তু এত বছরেও এখানকার নাগরিক সেবার কোনো উন্নতি হয়নি। আধুনিক সেবা দেওয়া তো দূরের কথা, সাধারণ কাজ চালাতেই হিমশিম খাচ্ছে এই পৌরসভা।
সম্প্রতি পৌরসভার সেবার মান বাড়াতে প্রায় দেড় কোটি টাকা দিয়ে নতুন কয়েকটি গাড়ি কেনা হয়েছে। কিন্তু গাড়িগুলো নিরাপদে রাখার মতো কোনো গ্যারেজ বা শেড নেই। ফলে খোলা আকাশের নিচে যেখানে-সেখানে ফেলে রাখায় নতুন গাড়িগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
গাড়ির পাশাপাশি রয়েছে চরম কর্মী সংকট। পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, ২৭ বর্গকিলোমিটার এলাকা এবং ২২০ কিলোমিটার রাস্তার জন্য স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন মাত্র ৭১ জন। রাস্তাঘাট পরিষ্কারের জন্য যেখানে প্রতি কিলোমিটারে ৩ জন কর্মী দরকার, সেখানে পুরো পৌরসভার জন্য আছে মাত্র ১৯৪ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী। অর্থাৎ এক কিলোমিটারে একজন কর্মীরও কম। আর ড্রেন পরিষ্কারের কাজে আছেন মাত্র ৪৫ জন কর্মী। নতুন কোনো নিয়োগ না থাকায় অল্পসংখ্যক কর্মী নিয়েই কোনোমতে কাজ চালানো হচ্ছে।
পৌরসভার এমন অব্যবস্থায় চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা খাইরুল ইসলাম বলেন, সারা বছরই ময়লা-আবর্জনা আর ড্রেন পরিষ্কার না থাকার ভোগান্তি পোহাতে হয়। বৃষ্টি হলে তো কথাই নেই, সামান্য বৃষ্টিতেই বেশিরভাগ এলাকা ডুবে যায়। অনেক এলাকায় বছরের আট মাসই জমে থাকে কাদা-পানি।
দক্ষিণ রাঘবপুর এলাকার বাসিন্দা কমল সেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তারা সময়মতো পৌরসভা থেকে সেবা পান না, কিন্তু পৌরকর বাড়ানোর বেলায় কোনো কমতি নেই। সেবা না পেয়ে কর দেওয়া নিয়ে ক্ষুব্ধ এলাকার মানুষ এভাবে চলতে থাকলে আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবেন বলে সতর্ক করেন তিনি।
একই সুরে আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন পাবনা চেম্বার অব কর্মাস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি ফোরকান রেজা বাদশা বিশ্বাস। তিনি বলেন, পাবনা পৌরসভার নাগরিক হিসেবে তারা খুব অসহায়, কারণ পৌরসভার দুর্দশা দেখার যেন কেউ নেই। যুগ পার হলেও সেবার মান একটুও বাড়েনি। অবিলম্বে এই সমস্যার সমাধান চান তিনি।
পাবনা বিসিক শিল্পনগরী সমিতির সভাপতি আফজাল হোসেন রাজা বলেন, পৌরসভার আনাচে-কানাচে সমস্যায় ভরা। সবাই মিলে একসঙ্গে উদ্যোগ না নিলে এই সমস্যা মিটবে না। আর পৌরসভা ভালো সেবা দিতে পারলে তবেই সাধারণ মানুষ শান্তিতে বসবাস করতে পারবে।
অবশ্য এসব সমস্যা মেটাতে আশার আলো দেখিয়েছেন পাবনা পৌরসভার প্রশাসক খাইরুল ইসলাম। তিনি জানান, নাগরিক সেবা বাড়াতে এবং নতুন ভবন তৈরীর জন্য কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাবনা সদর আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের সহযোগিতায় একটি বিশেষ উন্নয়ন প্রকল্পে পৌরসভাকে যুক্ত করার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এর পাশাপাশি ৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং গত ৭ জুলাই নতুন ভবনের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করা হয়েছে।
প্রশাসক আরও জানান, পৌরসভায় কর্মরত হরিজন কলোনির পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্য বহুতল ভবন নির্মাণের জন্য আবেদন করা হয়েছে। সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় অর্থের বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি আশা প্রকাশ করেন, খুব শিগগিরই এসব আবেদন অনুমোদন পাওয়া যাবে। পাবনা পৌরসভা যেমন প্রথম শ্রেণির মর্যাদা পেয়েছে, সেবার দিক থেকেও এটি প্রথম শ্রেণির হবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।


