রাজধানী ঢাকার মাতুয়াইল ডাম্পিং জোনের প্রায় দুই কিলোমিটার ভেতরে প্রতিদিন স্তূপ করা ময়লার মাঝে কাজ করেন নিপা আক্তার। তার হাতে নেই কোনো গ্লাভস, মুখে নেই মাস্ক, এমনকি পায়েও কোনো সুরক্ষা জুতো নেই। এই বর্জ্যের স্তূপের মধ্যেই তিনি দুপুরের খাবার খান। সেখানে হাত ধোয়ার জন্য সামান্য পানির ব্যবস্থাও নেই।
ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত কর্মীরা এভাবেই কোনো সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়া কাজ করে যাচ্ছেন দিনের পর দিন। এর ফলে তারা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন, যদিও অনেকে এই অসুস্থতার প্রকৃত কারণ বুঝতে পারেন না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা এবং কর্মীদের সচেতনতার অভাবে তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়েই চলেছে।
আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘উইট প্রেস’ প্রকাশিত ‘অকুপেশনাল হেলথ ইমপ্যাক্টস অন দ্য চাইল্ড ওয়েস্ট-পিকার্স অব ঢাকা সিটি’ শীর্ষক এক গবেষণায় দেখা গেছে, এসব কর্মী চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট, পেটের সমস্যা, চোখের রোগ, জ্বর এবং ধারালো বর্জ্য থেকে হওয়া ক্ষতের শিকার হন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় ৩০ শতাংশ কর্মী চর্মরোগে এবং ৪০ শতাংশ চোখের সমস্যা ও শ্বাসকষ্টে ভোগেন। এছাড়া ৪৭ শতাংশ কর্মী শরীরে ব্যথা এবং ২০ শতাংশ পেটের সমস্যায় আক্রান্ত। সাধারণ মানুষের তুলনায় এই কর্মীদের মধ্যে জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার হার ৬২ শতাংশ বেশি।
রাজধানীর দৈনন্দিন কয়েক হাজার টন গৃহস্থালি বর্জ্য দুটি ল্যান্ডফিলে ফেলা হয়। মাতুয়াইলে দীর্ঘ ২০ বছর ধরে ময়লা সংগ্রহের কাজ করছেন নিপা আক্তার। তিনি বাসা থেকে শুকনো খাবার এবং পানি সঙ্গে নিয়ে আসেন। কারণ দুই কিলোমিটার এলাকার মধ্যে পানি বা টয়লেটের কোনো ব্যবস্থা নেই। সেখানে প্রতিদিন কাজ করে ১৫ থেকে ২০ জন নারী ও বেশ কয়েকজন শিশু। রোদ-বৃষ্টি থেকে বাঁচতে কেউ কেউ কাপড়ের অস্থায়ী তাঁবু বানিয়ে বিশ্রাম নেন। এর পাশেই প্লাস্টিক পুড়িয়ে ধাতু আলাদা করার কাজ চলে।
আমিনবাজার ল্যান্ডফিলের চিত্রও একই রকম। সেখানকার কর্মীরা খালি হাতে এবং মাস্ক বা জুতো ছাড়াই বর্জ্য নাড়াচাড়া করেন। সেখানে কাজ করা রেহানা আক্তার জানান, তিনি ছোটবেলা থেকেই এই কাজ করছেন। এতে তার কোনো সমস্যা হয় না।
তবে রোকেয়া বেগম নামের আরেক কর্মী বলেন, তার তেমন কোনো সমস্যা না হলেও মাঝে মাঝে শ্বাসকষ্ট হয়।
ল্যান্ডফিলের ডিউটিতে থাকা আনসার সদস্য ইকবাল হোসেনকেও সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়া দেখা গেছে। তিনি জানান, শুরুতে কষ্ট হলেও এখন অভ্যাস হয়ে গেছে। মাস্ক পরলে গরম লাগে, তাই তিনি তা ব্যবহার করেন না।
বর্জ্যের আয়তন কমাতে প্রায়ই সেখানে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এক্সক্যাভেটর দিয়ে পাহাড়ের মতো উঁচু বর্জ্য কাটা হয়। ক্রেন অপারেটররাও সুরক্ষা ছাড়াই কাজ করেন।
মোহাম্মদপুরের সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশনে ১৫ বছর ধরে কর্মরত বাবুল মিয়া জানান, শেষবার করোনার লকডাউনের সময় তাদের মাস্ক, গ্লাভস এবং জুতো দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ময়লার মাঝে কাজ করতে গিয়ে সেগুলো বেশিদিন টেকেনি। তারা ভোর থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করেন। বেতন হিসেবে নতুনরা ১০ হাজার ও পুরনোরা ১২ হাজার টাকা পান। তবে তাদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা নেই।
বাবুল মিয়া আরও জানান, গরমে গ্লাভস পরলে হাত ঘেমে আঙুলের ফাঁকে ঘা হয়ে যায়। স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে তিনি বলেন, হাত-পা কেটে যাওয়া তাদের জন্য নিয়মিত ঘটনা। ঠিকমতো পরিষ্কার না হলে চুলকানি হয় এবং শরীর ব্যথা করে।
বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ এবং শ্রম বিধিমালা ২০১৫ অনুযায়ী, নিয়োগকর্তার পক্ষ থেকে সুরক্ষা সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং চিকিৎসার সুবিধা দেওয়া বাধ্যতামূলক। এছাড়া সিটি কর্পোরেশন ও স্থানীয় সরকার আইনের অধীনেও বর্জ্যকর্মী তদারকির দায়িত্ব রয়েছে।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের এসব বিধান কার্যকর করার কথা থাকলেও দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বক্তব্যে দায় এড়ানোর প্রবণতা দেখা গেছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. আরিফুর রহমান জানান, সব কর্মী তাদের নিজস্ব নয়, অনেকে ঠিকাদারের অধীনে কাজ করেন। নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়ে তিনি দাবি করেন, সিটি কর্পোরেশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকলেও কর্মীরা কাজ করার সময় সেগুলো ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না।
পরিচ্ছন্নতা পরিদর্শক সুপারভাইজার মো. সোহাগ হোসেন জানান, তিনি ঠিকাদারদের কয়েকবার বলেছেন কিন্তু কোনো ফল হয়নি।
মাতুয়াইল এক্সটেনশন প্রজেক্ট ডিরেক্টর মোহাম্মদ সফিউল্লাহ সিদ্দিক ভূঁইয়া এই বিষয়ে পরে কথা বলবেন বলে আর ফোন ধরেননি। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।


