ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি টার্মিনালের একটিতে অগ্নিকাণ্ডের আট দিন পরও দেশের এলএনজি অবকাঠামোর তদারকির দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রীয় সংস্থা পেট্রোবাংলা বলতে পারছে না, ঠিক কী কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে।
তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশন পেট্রোবাংলা বলছে, দেশের প্রথম বড় ধরনের এলএনজি টার্মিনাল দুর্ঘটনার মূল কারণ নির্ধারণের মতো প্রয়োজনীয় কারিগরি দক্ষতা ও বিশেষজ্ঞ জনবল তাদের নেই। ২০১৮ সালে বাণিজ্যিকভাবে এলএনজি আমদানি শুরু হওয়ার পর এটিই সবচেয়ে গুরুতর টার্মিনাল বিপর্যয়।
এই ঘটনা ভাসমান স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) তদারকিতে বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ঘাটতি সামনে নিয়ে এসেছে। অথচ দেশের ক্রমবর্ধমান প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা পূরণে এসব এফএসআরইউ এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশনস) রফিকুল ইসলাম টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব সক্ষমতায় এই দুর্ঘটনার মূল কারণ নির্ধারণ করার মতো কারিগরি দক্ষতা নেই।’
এমন স্বীকারোক্তি এমন এক সময়ে এল, যখন ২০১৮ সালে দেশের প্রথম ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল চালুর পর এই প্রথম কোনো অফশোর এলএনজি আমদানি টার্মিনাল দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ রয়েছে।
এই টার্মিনালটি বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন আনুমানিক ৪৫০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। ফলে দেশের মোট এলএনজি সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এর প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক কার্যক্রম এবং সারা দেশের আবাসিক গ্যাস সরবরাহে।
গত ২১ জুলাই দুপুরের দিকে মহেশখালীর এফএসআরইউতে এই দুর্ঘটনা ঘটে। এটি দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি আমদানি টার্মিনালের একটি।
পেট্রোবাংলা ও রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) তথ্যমতে, একটি এলএনজি ট্যাংকার থেকে জাহাজ-থেকে-জাহাজে (শিপ-টু-শিপ) এলএনজি স্থানান্তরের সময় দুর্ঘটনাটি ঘটে।
কারিগরি ত্রুটির পর টার্মিনালের ভেতরে আগুন লাগে। নিরাপত্তার স্বার্থে সঙ্গে সঙ্গে রিগ্যাসিফিকেশন কার্যক্রম স্থগিত করা হয় এবং পুরো টার্মিনাল বন্ধ করে দেওয়া হয়।
কোন যন্ত্রে ত্রুটি হয়েছিল বা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কত—এ বিষয়ে এখনো কিছু জানায়নি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে মেরামতকাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, টার্মিনালের রিগ্যাসিফিকেশন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কিছু যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সেগুলো বদলাতে হবে।
এই দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থায় দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানের চেয়ে গ্যাস সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক করাকেই এখন বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
পুনরুদ্ধারে নেতৃত্ব বিদেশি বিশেষজ্ঞদের
দুর্ঘটনার পর থেকে পেট্রোবাংলা ও আরপিজিসিএলের সহযোগিতায় টার্মিনালটির পরিচালনাকারী যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক্সিলারেট এনার্জি দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে, যেন আবার দ্রুত কার্যক্রম চালু করা যায়।
মহেশখালী টার্মিনালে যুক্তরাজ্য, রোমানিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকে বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীরা এসেছেন। একই সঙ্গে দ্রুত মেরামতের জন্য বিকল্প যন্ত্রাংশ, গুরুত্বপূর্ণ খুচরা যন্ত্রপাতি এবং বিশেষায়িত সরঞ্জাম উড়োজাহাজে করে বাংলাদেশে আনা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, সমুদ্রপথে আসার জন্য অপেক্ষা না করে ভারী ও উচ্চমূল্যের যন্ত্রাংশ উড়োজাহাজে আনার সিদ্ধান্তই প্রমাণ করে, টার্মিনালটি দ্রুত চালু করার বিষয়ে কতটা তাগিদ ছিল। কারণ, এই অচলাবস্থা বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা এবং কোটি মানুষের গ্যাস সরবরাহে চাপ সৃষ্টি করছে।
আরপিজিসিএলের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে মেরামতকাজ এগিয়ে চলছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আবদুল মান্নান টাইমসকে বলেন, সংস্থাটি মেরামতকাজ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বর্তমানে টার্মিনালে প্রায় ২০ জন প্রকৌশলী কাজ করছেন, যাঁদের অধিকাংশই বিদেশি বিশেষজ্ঞ।
শুধু মেরামতকাজেই নয়, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানেও বিদেশি বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভরশীলতা স্পষ্ট। বিদেশি প্রকৌশলীরা যখন ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল সচল করার কাজ করছেন, তখন পেট্রোবাংলা স্বীকার করছে, দুর্ঘটনার কারণ স্বাধীনভাবে নির্ধারণ করার সক্ষমতা তাদের নেই।
তদন্তও নিয়ন্ত্রক সংস্থার বাইরে
দেশের সবচেয়ে বড় এলএনজি টার্মিনাল বিপর্যয়ের কারিগরি তদন্তে নেতৃত্ব না দিয়ে পেট্রোবাংলা সেই দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় গঠিত একটি কমিটির ওপর।
কমিটির প্রধান করা হয়েছে মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব এ কে এম ফজলুল হককে।
তবে কমিটির কার্যপরিধি (টার্মস অব রেফারেন্স) কী, কীভাবে তদন্ত হবে কিংবা কবে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে—এসব বিষয়ে মন্ত্রণালয় কিছু জানায়নি। টাইমস অব বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে ফজলুল হকও কমিটির দায়িত্ব, তদন্তপদ্ধতি বা কার্যপরিধি নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
দেশের প্রধান এলএনজি তদারকি সংস্থার নেতৃত্বে তাৎক্ষণিক কোনো কারিগরি তদন্ত না হওয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি ও নিয়ন্ত্রক সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশ আমদানি করা এলএনজির ওপর ক্রমেই বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মহেশখালীর এই দুর্ঘটনার মূল কারণ চিহ্নিত করা শুধু ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটি সচল করার জন্যই নয়, ভবিষ্যতে দেশের অন্য এলএনজি অবকাঠামোয় একই ধরনের দুর্ঘটনা ঠেকাতেও অত্যন্ত জরুরি।
এই দুর্ঘটনা তাই শুধু গ্যাস সরবরাহে সাময়িক বিঘ্নের ঘটনা নয়। এটি আরও গভীর একটি দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে—বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ এলএনজি আমদানি অবকাঠামো গড়ে তুলেছে, কিন্তু সেই অবকাঠামোয় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তা স্বাধীনভাবে তদন্ত করার কারিগরি সক্ষমতা এখনো দেশের প্রধান তদারকি সংস্থা পেট্রোবাংলার নেই।


