কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকদের অবহেলাতেই আদ্-দ্বীনে ৬ নবজাতকের মৃত্যু

কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকদের অবহেলাতেই আদ্-দ্বীনে ৬ নবজাতকের মৃত্যু
এক সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। বৃহস্পতিবার বিকালে সচিবালয়ে। ছবি: মন্ত্রণালয়ের সৌজন্যে
Advertisement
Advertisement

ঢাকার মগবাজারে আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে দায়িত্ব পালন করা চিকিৎসক, নার্স, স্টাফ এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

বৃহস্পতিবার বিকালে সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ তুলে ধরে এ তথ্য জানান স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।

তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, হাসপাতালটির ভবন হাসপাতাল পরিচালনার জন্য উপযুক্ত নয়। সংশ্লিষ্ট পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ড (কক্ষ নম্বর-২) পরিদর্শনের পর কমিটি দেখতে পায়, দীর্ঘ সময় এসি বন্ধ থাকায় এবং স্বাভাবিক বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা না থাকায় সেখানে অক্সিজেনের ঘাটতি এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছিল।

কমিটি আরও জানিয়েছে, প্রায় ৯০০ বর্গফুট আয়তনের ওই কক্ষে ১১ জন নবজাতক, তাদের স্বজন এবং অন্যান্যদের মিলিয়ে প্রায় ৫০ জন অবস্থান করছিলেন, যা কক্ষটির ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি।

মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ময়নাতদন্ত ছাড়া সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণ সম্ভব নয়। তবে পারিপার্শ্বিক অবস্থা, সাক্ষ্য ও জবানবন্দি পর্যালোচনায় ধারণা করা হচ্ছে–দীর্ঘ সময় এসি বন্ধ থাকা, বদ্ধ কক্ষে অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতি এবং বিকল্প ভেন্টিলেশনের অভাবে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়া ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বেড়ে যাওয়াই (হাইপারক্যাপনিয়ার কারণে) মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ।

সার্বিক মূল্যায়নে তদন্ত কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, গত ২৭ মে ভোর ৫টা থেকে সকাল ৯টার মধ্যে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় দায়িত্বরত চিকিৎসক, নার্স, স্টাফ এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতা ও অবহেলা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, দায়িত্ব পালন করা সেবিকাদের দায়িত্বে ‘চরম অবহেলা ও অসহযোগিতা’ ছিল। নবজাতকদের শারীরিক অবস্থার আকস্মিক অবনতি হলেও হাসপাতালের পক্ষ থেকে কার্যকর জরুরি চিকিৎসা সাড়া পাওয়া যায়নি। অভিভাবকদের আহ্বানে সাড়া না দিয়ে সংশ্লিষ্ট নার্সরা চিকিৎসকদের বিষয়টি জানাননি। তারা উল্টো সময় নষ্ট করেছেন এবং মৃত্যুরোধে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করেননি।

এখানে বড় ধরনের প্রশাসনিক ব্যর্থতাও ছিল। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডে রোগীদের দেখাশোনার জন্য কোনো চিকিৎসক নিয়োজিত ছিলেন না। দায়িত্বরত নার্সদের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার কোনো প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি, পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা ছিল না এবং অতিরিক্ত সংখ্যক রোগীর স্বজনদের উপস্থিতিও নিয়ন্ত্রণ করা হয়নি। এ ছাড়া, হাসপাতালের ভেতরে অসংখ্য ছোট কাচের কক্ষ নির্মাণ করায় ভবনটি বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানতে চাইলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন দিয়েছে। এখন আমরা কর্তৃপক্ষ এই প্রতিবেদন নিয়ে বসব। বিদ্যমান আইনে যে শাস্তি দেওয়া যায় আমরা সেটা করব।’

আরও পড়ুন

হাসপাতালটি সিলগালা না করার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যে পোস্ট-অপারেটিভ রুমটা নন-ভেন্টিলেটেড ছিল, যেখানে অক্সিজেনের চাইতে অনেক বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড ছিল, ওটা আমরা সিলগালা করে রেখেছি। পুরো হাসপাতালে ২০০-এর বেশি রোগী আছে। পুরো হাসপাতাল হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া আইনসম্মত হবে না।’

মন্ত্রী জানান, আগামী দুই দিনের মধ্যে বিষয়টি পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়ে রোববারের মধ্যে তারা চূড়ান্ত পদক্ষেপ জানাবেন।

বেসরকারি হাসপাতালগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এই ঘটনার পরে আমরা আরও বেশি সিরিয়াস। গত তিন দিনে সিভিল সার্জন, জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছি। দিন দিন আমাদের নির্দেশনা এবং ব্যবস্থাপনা কঠোর থেকে কঠোরতর হবে।’

প্রতিবেদনে কোনো সুপারিশ না থাকার অভিযোগের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে দায়িত্বরত চিকিৎসক, নার্স, স্টাফ এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে অবহেলা প্রমাণিত হয়েছে। ওই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বিদ্যমান আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

‘জেল দেওয়ার মালিক আমরা না, আদালত। এ ঘটনায় ফৌজদারি মামলা হয়েছে।’

ময়নাতদন্ত না হওয়ায় মামলার ওপর কোনো প্রভাব পড়বে কি না জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘এটা কোনো গোপন ঘটনা না। এটি অত্যন্ত স্পষ্ট একটি ঘটনা। আদালত আসামিদের কোনো অযাচিত সুবিধা দেবেন না বলে বিশ্বাস।’

হাসপাতালটির অনুমোদন প্রসঙ্গে মন্ত্রী জানান, অনুমোদনের সময় ভবনটি নিয়ম অনুযায়ী ছিল। তবে পরে এর ভেতরে কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে রাজউকের প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে এবং এ বিষয়ে তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিদর্শন ব্যবস্থার ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তিনি বলেন, ‘পরিদর্শকরা সাধারণত পরিচ্ছন্নতা ও সেবার বিষয়গুলো দেখেন। নয়তলার ওপরে একটি বেকারি পরিচালিত হচ্ছিল, সেটি আমাদের কর্মকর্তাদের জানার কথা না। পরে খোঁজ নিয়ে সেখানে বেকারি এবং দাহ্য পদার্থের মজুতের বিষয়টি জানতে পারি।’

পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে ভেন্টিলেশন না থাকার বিষয়টি কেন নজরে আসেনি জানতে চাইলে তিনি বলেন, কক্ষটি সম্পূর্ণ বন্ধ হলেও দুটি এসির মাধ্যমে বায়ু চলাচল হতো।

‘যেই মুহূর্তে এসি বন্ধ ছিল, তখনই সমস্যা হয়েছে। ওই অবস্থায় রোগীদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া উচিত ছিল। ডিউটি ডাক্তারদের অবহেলা অনেক বেশি ছিল।’

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, এসি বন্ধ থাকার ঘটনা সেখানে প্রায় ঘটত। এ বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘ওদের কথা বিশ্বাস করি না। শতভাগ নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, এসি বন্ধ থাকার কারণে হাইপারক্যাপনিয়া এবং অক্সিজেনের ঘাটতিতে রোগীরা মারা গেছে।’

ভবিষ্যতে একই ধরনের অবহেলা পাওয়া গেলে হাসপাতাল বন্ধ বা শাটডাউন করে দেওয়া হবে কি না জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘শাটডাউন কথাটা বলবেন না। আইনে যে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে, সেটা নেব। শাটডাউন শব্দটি আইনে নেই। আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।’

তদন্ত কমিটি সুপারিশ করেছে, ভবিষ্যতে বেসরকারি হাসপাতালের নতুন লাইসেন্স দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ভবন কঠোরভাবে পরিদর্শন করা এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের পূর্বানুমতি বা ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক করা উচিত।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad