দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধের বিভীষিকা প্রজন্মের পর প্রজন্ম বয়ে বেড়াতে হবে গাজাবাসীকে। এমন শঙ্কা জানিয়েছেন জাতিসংঘের এক শীর্ষ যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ। আল জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘এটি যেন আরেকটি নাকবা’।
১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার সময় ফিলিস্তিনিদের জাতিগত নিধনের সময়টিই ‘নাকবা’ হিসেবে পরিচিত। জাতিসংঘ কর্মকর্তা বলেন, ‘গত দুই বছরে গাজায় যা ঘটেছে, তা নাকবার চেয়ে কোনো অংশেই কম বিধ্বংসী নয়। বরং আধুনিক বিশ্বে জাতিগত নিধনের সবচেয়ে ভয়ংকর ইতিহাস মনে হয় ইসরায়েলই সৃষ্টি করল।’
গাজায় আবাসন ও অবকাঠামোর ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞকে বর্ণনা করতে ‘ডোমিসাইড’ (বাসস্থান হত্যাকাণ্ড) শব্দটি ব্যবহার করে তিনি বলেন, ‘এটি ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের গণহত্যার অন্যতম উপাদান। বাড়িঘর ধ্বংস করা, মানুষকে তাদের বাড়ি থেকে এমনকি গোটা অঞ্চল থেকে উৎখাত করা এবং ওই এলাকাকে বসবাসের অযোগ্য করে তোলা–গণহত্যারই আরেক রূপ।’
যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা পুনর্গঠন সহজ হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘গাজাবাসী ঘরে ফিরতে শুরু করেছে ঠিকই কিন্তু তাদের আদতে কোনো ঠিকানা নেই। যা আছে তা কেবল ধ্বংসস্তূপ এবং নিহত স্বজনের স্মৃতি। শিশু থেকে বৃদ্ধ… প্রত্যেক ফিলিস্তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তারা ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত, গুলি এবং গোলার আঘাতে জর্জরিত।’
ইসরায়েলকে অবিলম্বে গাজা উপত্যকায় তাবু ও কাফেলা (কারাভ্যান) প্রবেশের অনুমতি দিতে হবে দাবি করে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘শরণার্থীরা যুদ্ধবিরতিতে উত্তর গাজায় ফিরতে শুরু করেছে। কিন্তু তাদের কাছে নিরাপদে রাত কাটানোর মতো তাবুও নেই। আশেপাশের পুরো এলাকা বিধ্বস্ত।’

জাতিসংঘের ‘পর্যাপ্ত আবাসনের অধিকার’ বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক বলাকৃষ্ণণ রাজাগোপাল শনিবার আল জাজিরাকে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘বাস্তুচ্যুতরা যখন উত্তর গাজায় ফিরে যাচ্ছেন, তখন তাদের সামনে শুধুই ধ্বংসস্তূপ এবং অনিশ্চিত জীবন অপেক্ষা করছে। তারা হয়তো এই যাত্রায় যুদ্ধ থেকে বেঁচে ফিরছেন, তবে সম্পদ বলতে আর কিছুই নেই। এই হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতা গভীর মানসিক ভীতি তৈরি করছে।’
‘চলতি বছরের শুরুতে যুদ্ধবিরতির সময় গাজায় তাঁবু ও কাফেলা (কারাভ্যান) পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ইসরায়েলের কঠোর অবরোধের কারণে গাজায় কোনো সহায়তাই ঢুকতে পারেনি।’
এবারের যুদ্ধবিরতিতেও ইসরায়েলি অবরোধ প্রত্যাহার মূল বিষয় উল্লেখ করে রাজাগোপাল বলেন, ‘আমার মতে, এটিই আসল বিষয়। যতক্ষণ না ইসরায়েল গাজার মূল প্রবেশপথ থেকে সরে না আসে, ত্রাণবাহী যান নিয়ন্ত্রণ করা বন্ধ না করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত গাজায় মানুষের জন্য জরুরি সহায়তা পৌঁছানো সম্ভব নয়। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
গত শুক্রবার ফিলস্তিনের সশস্ত্রগোষ্ঠী হামাসের সঙ্গে ঐতিহাসিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি করেছে ইসরায়েল। গাজার পুরো উপত্যকাজুড়ে ইসরায়েলি অভিযান ও বোমাবর্ষণ বন্ধের পাশাপাশি সেনারা পিছু হটায় স্বস্তি নেমেছে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের মনে।
জাতিসংঘের হিসেব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজার ৯২ শতাংশ আবাসিক ভবন মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত বা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। এতে অস্থায়ী শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন লাখ লাখ মানুষ। গত দুই বছরে ইসরায়েলি হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ৬৮ হাজার ফিলিস্তিনি। যাদের মধ্যে বেশিরভাগই নারী ও শিশু।


