ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি: চিকিৎসার খরচ মেটাতে দিশেহারা মধ্যবিত্ত

ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি: চিকিৎসার খরচ মেটাতে দিশেহারা মধ্যবিত্ত
প্রতীকী ছবি
Advertisement
Advertisement

দেশের লাখ লাখ নিম্ন আয়ের পরিবারের কাছে প্রয়োজনীয় ওষুধ কেনা এখন আর কোনো সাধারণ খরচ নয়, বরং প্রতি মাসের এক বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। ওষুধের ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী দাম এবং বাজারে ওষুধ সরবরাহের অনিশ্চয়তায় অনেক পরিবার এখন চিকিৎসার খরচ কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। কেউ কেউ আবার পুরোপুরি চিকিৎসা বন্ধ করে দিচ্ছে, যা সরকারি তদারকি এবং স্বাস্থ্যসেবার মৌলিক অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

রাজধানীর বাড্ডা এলাকার একটি ছোট ফার্মেসিতে স্বামীর হৃদরোগের ব্যবস্থাপত্র নিয়ে শান্তভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন ৬২ বছর বয়সী রহিমা বেগম। কিছুক্ষণ পর তাকে দেখা গেল প্রয়োজনীয় ওষুধের মাত্র অর্ধেক নিয়ে বেরিয়ে আসছেন।

তিনি আক্ষেপ করে বললেন, প্রতি মাসে আমাদের চাল, মাছ ও সবজির খরচ কমাতে হয়, আর এখন ওষুধের খরচও কমাতে হচ্ছে। এভাবে আমরা আর কতদিন বেঁচে থাকতে পারব? রহিমা বেগমের এই হাহাকার কেবল বাড্ডাতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং পুরো রাজধানী ছাড়িয়ে সারা দেশেই একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।

কাঁঠালবাগান এলাকায় এক ক্রেতাকে ওষুধের দাম নিয়ে বিক্রেতার সঙ্গে তর্কে জড়াতে দেখা গেল। ওই ক্রেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, আগে মায়ের ওষুধের জন্য মাসে সাড়ে ৪ হাজার টাকা খরচ হতো, এখন তা বেড়ে সাড়ে ৬ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে।

তিনি জানতে চান, আসলে কি ওষুধের দাম বেড়েছে নাকি দোকানিরা বেশি রাখছেন? প্রান্তিক আয়ের মানুষের কাছে এই তর্কের চেয়েও বড় সত্য হলো পকেট থেকে বেরিয়ে যাওয়া বাড়তি টাকা, যা তাদের দৈনন্দিন জীবনকে করে তুলছে দুর্বিষহ।

ফার্মেসি মালিকদের দাবি, গত কয়েক মাসে নিয়মিত ব্যবহৃত ওষুধের দাম হু হু করে বেড়েছে। পাইকারি বাজারে অস্থিরতা এবং সরবরাহ সংকটের কারণেই তারা দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন। কাঁঠালবাগানের এক খুচরা ওষুধ দোকানের বিক্রেতা জানান, সরবরাহ যখন অনিয়মিত হয়, তখন পাইকারি বিক্রেতারা দাম বাড়িয়ে দেন। ফলে খুচরা বিক্রেতাদের আর কিছু করার থাকে না। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, শ্বাসকষ্টের জন্য ব্যবহৃত জাইফ্লো ১০ মিলিগ্রাম ট্যাবলেটের দাম দুই মাস আগে ছিল ১৫ টাকা, যা এখন ১৭ থেকে ১৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আজমাসল ও সল্টোনিন ইনহেলারের দাম ২২০ টাকা থেকে বেড়ে ২৫০ টাকা হয়েছে। গত এক বছরে আফরিন নেজাল ড্রপসের দাম ৫০ টাকা থেকে ৭০ টাকা, সেকলো ২০ মিলিগ্রাম ৫০ টাকা থেকে ৬০ টাকা এবং এলাট্রল প্রতি পাতা ২০ টাকা থেকে ৩০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ক্রেতারা বলছেন, শীত আসার আগে যখন ইনহেলারের চাহিদা বাড়ে, তখনই এর দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়।

তবে ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো পরিকল্পিতভাবে দাম বাড়ানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছে। স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জানান, তাদের কোম্পানি কোনো ওষুধের দাম বাড়ায়নি। তিনি উল্লেখ করেন, ওষুধের দাম সংশোধন করতে হলে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের (ডিজিডিএ) অনুমোদন প্রয়োজন হয়। খুচরা পর্যায়ে বাড়তি দামে বিক্রির বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।

আরও পড়ুন

অন্যদিকে, অ্যালবিয়ন ল্যাবরেটরিজ লিমিটেডের সিইও মোহাম্মদ নেজাম উদ্দিন জানান, ডলারের বিনিময় হার এবং বিশ্ববাজারে কাঁচামালের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে, যার ফলে ধীরে ধীরে কিছু মূল্যসমন্বয় করা হয়েছে। তিনি দীর্ঘসময় ধরে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কোনো মূল্য সমন্বয়ের পদক্ষেপ না থাকাকেও ওষুধের দাম বাড়ার জন্য দায়ী করেন।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক মো. আক্তার হোসেন জানান, সাম্প্রতিক সময়ে ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক নীতিমালা জারি করা হয়নি। গত কয়েক মাসে দাম নির্ধারণে কোনো সভাও হয়নি।

তিনি বলেন, নীতিমালা জারি হলে একটি কমিটি গঠন করে ওষুধ কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে দাম নির্ধারণ করা হবে। কোম্পানিগুলো দাম না বাড়ানোর দাবি করা সত্ত্বেও বাজারে বাড়তি দাম কেন-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ ধরনের অভিযোগের সত্যতার জন্য বাজার থেকে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রয়োজন।

বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প দেশের চাহিদার প্রায় সবটুকু মিটিয়ে ১৫৭টি দেশে রপ্তানি করার সফলতা দাবি করলেও এর মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া নিয়ে রয়েছে নানা জটিলতা। দেশে ৩১০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান ৩৫ হাজারেরও বেশি ব্র্যান্ডের ওষুধ তৈরি করলেও সরকার মাত্র ১১৭টি জেনেরিক ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ করে। বাকি সব ওষুধের দাম নির্ধারণ করে কোম্পানিগুলো নিজেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের ২৪ শতাংশ পরিবার চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। প্রতি বছর প্রায় ৬২ লাখ মানুষ স্বাস্থ্যসেবার খরচ মেটাতে গিয়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে ৭৩৯টি জীবন রক্ষাকারী ওষুধের দাম নির্ধারণ করতে হাইকোর্টের একটি নির্দেশনা থাকলেও তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।

ঔষধ প্রশাসনের পরিচালক মো. আশরাফ হোসেন জানান, আদালতের নির্দেশনা মানা বাধ্যতামূলক হলেও মন্ত্রণালয় থেকে এখনো চূড়ান্ত নীতিমালা পাওয়া যায়নি। নীতিমালা না আসা পর্যন্ত তারা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নীতিমালার কাজ চলছে এবং দ্রুতই তা চূড়ান্ত হবে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) পরিচালক এএইচএম শফিকুজ্জামান বলেন, নির্ধারিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের চেয়ে বেশি দামে ওষুধ বিক্রি করা দণ্ডনীয় অপরাধ। তবে ঔষধ প্রশাসনের পরিচালক আক্তার হোসেনের দাবি: ওষুধের দোকানে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে এবং অভিযোগের তদন্ত হচ্ছে। বাজার তদারকির আরেক প্রতিষ্ঠান জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, তারা বাজারে শুধু ওষুধের মেয়াদ ও লেবেলিংয়ের বিষয়গুলো দেখে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, সরকার ভর্তুকি ছাড়া ওষুধের দাম সবসময় একরকম রাখা সম্ভব নয়। উৎপাদন খরচ বাড়লে মূল্য সমন্বয় করতেই হয়। তবে এখানে আসল সমস্যা হলো নিয়মিত তদারকি এবং সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অভাব।

ওষুধের দাম নির্ধারণে নীতিমালার খসড়া আর আইনি মারপ্যাঁচে সময়ক্ষেপণ হওয়ার ফলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ, যাদের কাছে সুচিকিৎসা পাওয়া এখন বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad