যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যে রাসায়নিক তরলভর্তি বিশাল ট্যাংকার বিস্ফোরণে অন্তত এক শ্রমিক নিহত ও নয়জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। বিস্ফোরণের ঘটনায় নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত নয়জন।
লংভিউ শহরের নিপ্পন ডাইনাওয়েভ প্যাকেজিং কোম্পানির কাগজ কারখানায় স্থানীয় সময় মঙ্গলবার এ দুর্ঘটনা ঘটে।
বার্তা সংস্থা এপির খবরে বলা হয়, ওই ট্যাংকারটিতে প্রায় ১০ লাখ গ্যালন ক্ষয়কারী রাসায়নিক তরল মজুত ছিল। বিস্ফোরণের ফলে সেটি কারখানার ভেতরের দিকে ধসে পড়ে।
উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া লংভিউ ফায়ার সার্ভিসের জরুরি বিভাগের কর্মীরা বলছেন, বিস্ফোরণের কয়েক ঘণ্টা পরও ধসে পড়া ট্যাংকের ভেতরে কিছু রাসায়নিক তরল রয়ে যাওয়ায় উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হচ্ছে।
এক লিখিত বিবৃতিতে উদ্ধারকর্মীরা জানান, ট্যাংকটি এখনও অস্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে, যা উদ্ধারকর্মীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করছে। নিরাপদে উদ্ধার অভিযান চালাতে কাঠামোটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল করার কাজ চলছে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে এপির প্রতিবেদন জানিয়েছে, আহতদের মধ্যে ফায়ারসার্ভিসের একজন কর্মীও রয়েছেন। কয়েকজন দগ্ধ হয়েছেন এবং কেউ কেউ বিষাক্ত গ্যাসে শ্বাস নেওয়ায় গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।
তবে সাধারণ মানুষের জন্য ওই এলাকায় তাৎক্ষণিক কোনো ঝুঁকি নেই বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
কাউলিটজ অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার বিভাগের প্রধান স্কট গোল্ডস্টেইন বলেন, ‘এখানে যারা উদ্ধারকাজে অংশ নিচ্ছেন, তাদের বন্ধু ও স্বজনদের অনেকেই ওই কারখানায় কাজ করেন। ঘটনাটি সবার জন্যই মর্মান্তিক। শ্রমিক ও উদ্ধারকর্মীদের সহায়তায় আলাদা নেটওয়ার্কও সক্রিয় করা হয়েছে।’
তবে দুর্ঘটনার কারণ এখনও জানা যায়নি বলে জানিয়েছেন স্কট গোল্ডস্টেইন।
দুর্ঘটনার পর প্রথমে কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, ট্যাংকটির ধারণক্ষমতা ছিল ৮০ হাজার গ্যালন বা প্রায় তিন লাখ তিন হাজার লিটার। পরে তারা সেই তথ্য সংশোধন করে জানান, ট্যাংকে প্রায় নয় লাখ গ্যালন বা ৩৪ লাখ লিটার ‘সাদা তরল’ (হোয়াইট লিকুইড) নামে পরিচিত রাসায়নিক মিশ্রণ ছিল।
এই তরলে মূলত সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড ও সোডিয়াম সালফাইড থাকে। নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় এটি কাঠ ভেঙে ক্রাফট কাগজ তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। এই ধরনের টেকসই কাগজ প্যাকেজিং, কেনাকাটার ব্যাগসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
লংভিউ অগ্নিনির্বাপণ বিভাগের ব্যাটালিয়ন প্রধান মাইক গরসাচ বলেন, ‘প্রায় ৪০ জন দমকলকর্মী ও চিকিৎসাকর্মী ঘটনাস্থলে আছেন। আঞ্চলিক বিপজ্জনক রাসায়নিক মোকাবিলা দলও সেখানে কাজ করেছে। আক্রান্তদের শরীর থেকে রাসায়নিক দূর করে তাদের লংভিউ ও ওয়াশিংটনের ভ্যাঙ্কুভারের বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।’
ট্যাংক ফেটে যাওয়ার পর সাদা রাসায়নিক তরল একটি পানি নিষ্কাশন খালে ছড়িয়ে পড়ে বলে জানিয়েছেন অঙ্গরাজ্যের পরিবেশ বিভাগ মুখপাত্র ব্রিটনি গুডসেল। পরিস্থিতির প্রভাব মূল্যায়নে বিভাগটি একটি বিশেষ দল পাঠিয়েছে।
ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের মার্কিন সিনেটর প্যাটি মারে এক লিখিত বিবৃতিতে ঘটনাটিকে ‘চরম মর্মান্তিক’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘যারা স্বজন হারিয়েছেন এবং যারা আহত হয়েছেন, তাদের সবার প্রতি আমার সমবেদনা রইল।’
এদিকে কারখানায় বিস্ফোরণের খবর ছড়িয়ে পড়তেই মঙ্গলবার কোম্পানির দর্শনার্থী প্রবেশপথে স্বজনদের অপেক্ষায় ভিড় করেন অনেকে। কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের নিশ্চিত তথ্য পেতে কাছের একটি শ্রমিক ইউনিয়ন ভবনকে পরিবার সহায়তা কেন্দ্রে রূপান্তর করা হয়।
নিপ্পন ডাইনাওয়েভ প্যাকেজিং কোম্পানির এই কারখানাটি লংভিউ শহরের কলম্বিয়া নদীর তীরে অবস্থিত একটি কাগজ ও তরল প্যাকেজিং উৎপাদন কেন্দ্র। ১৯২০-এর দশক থেকে প্রায় ৩৮ হাজার জনসংখ্যার এই শহরটির সঙ্গে কাগজ ও কাঠশিল্পের গভীর সম্পর্ক। মূলত কানসাস সিটির এক কাঠ ব্যবসায়ী শহরটি প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কারখানায় প্রায় এক হাজার মানুষ কাজ করেন। এখানে টিস্যু, ছাপার কাগজ, কাপ, প্লেট, কার্টনসহ বিভিন্ন পণ্যের উপকরণ তৈরি করা হয়। শিল্পাঞ্চলটিতে আরও অনেক কাঠ, কাগজ ও রাসায়নিক শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
এমন সময়ে এই বিস্ফোরণ ঘটল, যখন দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার এরইমধ্যে হাজারও বাসিন্দা একটি মহাকাশযান কারখানার ক্ষতিগ্রস্ত রাসায়নিক ট্যাংকের কারণে ঘরছাড়া অবস্থায় রয়েছেন।
পরিবেশবিষয়ক ন্যায়বিচার নিয়ে কাজ করা কয়েকটি সংগঠনের জোটের ২০২৩ সালের শেষ দিকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে বিপজ্জনক রাসায়নিক দুর্ঘটনায় ৪০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।


