এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে বেশ পতন দেখা দিয়েছে চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডে। প্রকাশিত ফলে দেখা গেছে, বন্দরনগরীতে এবার পাসের হার ৫২ দশমিক ৫৭ শতাংশ, যা গতবারের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ কম।
পুরো বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬ হাজার ৯৭ শিক্ষার্থী। যা গতবারের তুলনায় প্রায় ৪ হাজার কম।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বোর্ড প্রতিষ্ঠার পর এমন নিম্নমানের ফল আর কখনও দেখা যায়নি। পাসের হার এবং জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় ফল বিপর্যয়ের কঠিন দৃশ্য।
এর আগে বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ড মিলনায়তনে আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল ঘোষণা করেন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী।
ফলাফলের নিম্নগতির কারণ জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এবার কঠোর নির্দেশনা ছিল, কোনোভাবেই ওভারমার্কিং করা যাবে না। শিক্ষার্থীরা যা লিখেছে, তার ভিত্তিতেই মূল্যায়ন করা হয়েছে।’
‘আগে কিছু ক্ষেত্রে বেশি নম্বর দেওয়ার প্রবণতা ছিল। সেটার ওপর ভরসা করে অনেকে হয়তো ভেবেছেন কম লিখলেও বেশি নম্বর পাওয়া যাবে। এর সঙ্গে জুলাই আন্দোলনসহ সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ পড়ালেখায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে’, যোগ করেন তিনি।
চট্টগ্রাম বোর্ডের ফলাফল
প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায়, চট্টগ্রাম জেলা ও মহানগর, তিন পার্বত্য জেলা এবং কক্সবাজার মিলিয়ে চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের অধীনে এবার পরীক্ষায় অংশ নেয় ১ লাখ ২ হাজার ৯৭০ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে পাস করেছেন ৫৩ হাজার ৫৬০ জন। পাসের হার এসেছে ৫২ দশমিক ৫৭ শতাংশ।
গতবার পাসের হার ছিল ৭০ দশমিক ৩২ শতাংশ। আর জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১০ হাজার ২৬৯ জন শিক্ষার্থী।
এর মধ্যে চট্টগ্রাম নগরীতে পাসের হার ৭০ দশমিক ৯০ শতাংশ। আর নগরী বাদে জেলায় পাসের হার ৪৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে রাঙামাটিতে পাসের হার ৪১ দশমিক ২৪ শতাংশ, খাগড়াছড়িতে ৩৫ দশমিক ৫৩ এবং বান্দরবানে ৩৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ। কক্সবাজার জেলায় পাসের হার ৪৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার সবচেয়ে বেশি, ৭৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে পাসের হার ৫৫ দশমিক ৩০ শতাংশ এবং মানবিক বিভাগে ৩৭ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ।
এবার ছাত্রদের পাসের হার ৪৮ দশমিক ৯৫ শতাংশ, আর ছাত্রীদের পাসের হার ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ, যা স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে মেয়েদের অগ্রগতি ছেলে শিক্ষার্থীদের থেকে তুলনামূলক বেশি।

শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বক্তব্য
কাঙ্ক্ষিত ফল পেয়ে উচ্ছ্বসিত বন্দরনগরীর অনেক পরীক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবক। আবার অনেককেই অনাকাঙ্ক্ষিত ফলে কান্নাকাটি করছেন। পরীক্ষায় কৃতকার্য এক নারী শিক্ষার্থী বলেন, ‘অন্য বছরের তুলনায় এবার পরীক্ষা খারাপ হয়েছে অনেকের। তবে আমি পাশ করায় খুব ভালো লাগছে। এই রেজাল্টের পিছনে বাবা-মা, শিক্ষক, বন্ধুদের অবদান অনেক।’
এক অভিভাবক উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার মেয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে। এবার প্রশ্ন অনেক কঠিন ছিল। সে অনুযায়ী খুব চিন্তিত ছিলাম, রেজাল্ট খারাপ করে ফেলে কিনা। গত বছর যে ফলাফল হয়েছে। এবার সে তুলনায় অনেক কম এসেছে।’
ফল বিপর্যয়ের কারণ শিক্ষকের অভাব
পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনি জেলায় ফল বিপর্যয়ের পেছনে শিক্ষকের অপ্রতুলতাকে দায়ী করেন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পারভেজ সাজ্জাদ। তিনি জানান, বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসি) মাধ্যমে ওই জেলাগুলোর শিক্ষক নিয়োগ হলেও অনেকেই অল্প সময় পরেই কর্মস্থল ছেড়ে চলে যান। ফলে নিয়মিত ক্লাস না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা ব্যাহত হচ্ছে।
শিক্ষা ব্যবস্থার এ সংকট মোকাবেলায় শিক্ষকের অভাব নিরসনের পাশাপাশি বৃত্তি প্রোগ্রাম চালু, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, মূল্যায়নে রুব্রিক্স পদ্ধতি চালুর পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতন করতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।


