ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে অবৈধ অর্থপ্রবাহ ও নির্বাচনী অনিয়ম ঠেকাতে মোবাইল ফাইন্যানশিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) খাতে ৮ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত লেনদেন সীমিত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। সীমিত সময়ের জন্য হলেও এমন উদ্যোগ দেশের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন আর্থিক লেনদেনের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে, এমন আশঙ্কা প্রকাশ করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বর্তমানে এমএফএস গ্রাহকরা দিনে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা এবং মাসে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন করতে পারেন। একই সঙ্গে দিনে সর্বোচ্চ ৫০টি এবং মাসে ১০০টি লেনদেনের সুযোগ রয়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক ও নির্বাচন কমিশনের সমন্বয়ে নেওয়া প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে, নির্বাচনী সময়ের জন্য দিনে সর্বোচ্চ লেনদেনের সীমা ১০ হাজার টাকা এবং লেনদেন সংখ্যা ১০টিতে নামিয়ে আনা হতে পারে। অর্থাৎ যে ডিজিটাল ব্যবস্থা প্রতিদিন হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেন নির্বিঘ্নে পরিচালনা করছে, সেটিকেই কয়েক দিনের জন্য নিয়ন্ত্রিত গতিতে চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
এই সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য প্রভাব বোঝার জন্য এমএফএস খাতের সামগ্রিক পরিসংখ্যান গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে এমএফএসে নিবন্ধিত গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ২৩ কোটি ৯৩ লাখ। দেশের মোট জনসংখ্যার তুলনায় এই সংখ্যা বেশি হওয়ায় স্পষ্ট হয়, একজন নাগরিকের একাধিক এমএফএস অ্যাকাউন্ট আছে। এসব অ্যাকাউন্টে মাসিক গড় লেনদেনের পরিমাণে এক লাখ ২০ হাজার থেকে এক লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা দৈনিক হিসাবে দাঁড়ায় চার হাজার থেকে চার হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এই হিসাবে নির্বাচনী বিধিনিষেধের আওতায় থাকা ছয় দিনে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে মোট লেনদেন হওয়ার কথা ছিল প্রায় ২৪ হাজার থেকে ২৭ হাজার কোটি টাকা।
ডিজিটাল লেনদেনের সামগ্রিক চিত্র আরও বিস্তৃত। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, নভেম্বর ২০২৫ মাসে মোট ডিজিটাল লেনদেনের সংখ্যা ছিল ৬৬ কোটি ৬৬ লাখ ৩৩ হাজার ৪১৭টি, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১৫ লাখ ৮৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ওই মাসে দৈনিক গড়ে প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকার ডিজিটাল লেনদেন হয়েছে। এর একটি বড় অংশ এসেছে এমএফএস চ্যানেল থেকে। বিশেষ করে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি (পিটুপি) লেনদেনের পরিমাণ ছিল প্রায় চার লাখ ৮১ হাজার কোটি টাকা, যা দৈনিক হিসাবে প্রায় এক হাজার ৬০০ কোটি টাকার সমান।
গ্রাম থেকে শহরে টাকা পাঠানো, পরিবারের খরচ নির্বাহ, ছোট ব্যবসার কাঁচামাল কেনা কিংবা দৈনিক মজুরি পরিশোধ–এসব কার্যক্রমের বড় অংশই এই পিটুপি লেনদেনের ওপর নির্ভরশীল। ফলে নির্বাচনী সময়ে এমএফএস খাতেই সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। দিনে ৫০ হাজার টাকা লেনদেনের সুযোগ থেকে হঠাৎ করে ১০ হাজার টাকায় নেমে আসার অর্থ হলো, বড় অঙ্কের লেনদেন ছোট ছোট পাঁচ ভাগ করে ফেলতে হবে। এতে একদিকে যেমন সময় বাড়বে, অন্যদিকে লেনদেন খরচও বাড়তে পারে।
ব্যক্তি পর্যায়ে এই সিদ্ধান্তের বাস্তব প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক অতনু রাব্বানি। টাইমস অব বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘যারা অনলাইন ব্যবসা করে বা পরিবারে রেমিট্যান্স পাঠায়, তাদের জন্য ওই সময়ে অর্থ প্রেরণ বা গ্রহণ করা কিছুটা কঠিন হয়ে যাবে।’নগদ অর্থ হাতে না থাকলে মানুষের দৈনন্দিন কাজের গতি ব্যাহত হতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, এই সময় বড় ধরনের ব্যয় এড়িয়ে চলা ছাড়া মানুষের তেমন কোনো বিকল্প থাকবে না।
একই ধরনের উদ্বেগ তুলে ধরেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইনস্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. শহিদুল ইসলাম জাহিদ। তার মতে, ‘এই উদ্যোগ সাধারণ জনগণের জন্য কষ্ট সৃষ্টি করতে পারে, বিশেষ করে যারা বড় অঙ্কের টাকা ট্রান্সফার করতে চান।’
এমএফএস ব্যবস্থায় ক্যাশ-ইন ও ক্যাশ-আউটের প্রবাহও এই প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নভেম্বর ২০২৫-এ মোট ক্যাশ-ইন হয়েছে প্রায় চার লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা, ক্যাশ-আউট হয়েছে প্রায় তিন লাখ ৭৪ হাজার কোটি টাকা। দৈনিক হিসাবে ক্যাশ-ইন প্রায় এক হাজার ৪০০ কোটি এবং ক্যাশ-আউট প্রায় এক হাজার ২৫০ কোটি টাকা।
নির্বাচনী বিধিনিষেধে দিনে লেনদেনের সীমা কমে গেলে এই নগদ প্রবাহে সরাসরি চাপ তৈরি হবে। ফলে অনেক গ্রাহক হয় লেনদেন স্থগিত রাখবেন, নয়তো বিকল্প অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের দিকে ঝুঁকতে পারেন—যা অবৈধ অর্থপ্রবাহ ঠেকানোর মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
এই উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদরা। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান এম. মাসরুর রিয়াজ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘শুধু এমএফএস লেনদেনের পরিমাণ সীমাবদ্ধ করে ভোটের সময় টাকার অপব্যবহার রোধ করা সম্ভব নয়। ভোটারদের ভোট কিনতে প্রার্থীদের নগদ অর্থ ব্যবহারের আশঙ্কা থেকেই যায়। তাই এই উদ্যোগ খুব কার্যকর হবে না।’
তিনি আরও বলেন, সাধারণ মানুষের ভোগান্তির কথা বিবেচনায় নিয়ে সরকার চাইলে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে পারে।
একই ধরনের মত দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান। টাইমস অব বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘এই সিদ্ধান্ত একমাত্র পথ নয়। নির্বাচনের সময় টাকা অপব্যবহার রোধ করতে বহুমুখী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। এমএফএস সিস্টেমে একাধিক নাম্বার ব্যবহার করা যায়, তাই একটি চ্যানেল সীমাবদ্ধ করে সব নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।’ পাশাপাশি তিনি উল্লেখ করেন, ‘এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য হলো নির্বাচনে অর্থ সংক্রান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা। তবে নির্বাচনের সব ধরনের অপব্যবহার ঠেকাতে সমন্বিত ও বহুমাত্রিক তৎপরতা চালানো জরুরি।’


