দুজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, চারজন টেকনিশিয়ান এবং কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাসহ নানাবিধ জটিলতায় অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে কুড়িগ্রামে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের ইকো ও ইটিটি মেশিন। ফলে জেলার নয় উপজেলার প্রায় ২৩ লক্ষ মানুষের হৃদরোগ নির্ণয়ের জন্য একটিও সরকারি মেশিন নেই। যার কারণে ২০০ টাকার পরীক্ষা বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে গিয়ে করাতে হচ্ছে ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকায়। এতে করে বাড়তি টাকা খরচ হচ্ছে গ্রামের হতদরিদ্র মানুষগুলোর। আর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে বারবার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করেও মিলছে না সমাধান।
তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৩ সালে উন্নত সেবা দেওয়ার লক্ষ্যে জেলাবাসীর জন্য চালু করা হয় ইকোকার্ডিওগ্রাফি সেবা। যার মূলকাজই হলো হৃদরোগ নির্ণয় করা। এই মেশিন দিয়ে রোগ নির্ণয় করে চিকিৎসক রোগীকে সুচিকিৎসা দেবে। তবে চালু হওয়ার প্রায় এক মাস পর ওই বছরের নভেম্বর মাসে পাসওয়ার্ডজনিত জটিলতায় বন্ধ হয়ে যায় ইকো যন্ত্র। ফলে প্রতিনিয়ত বহিঃবিভাগ ও হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীদের হৃদরোগের পরীক্ষা করাতে হচ্ছে বাইরের ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে। রোগী আন নেওয়ার ভোগান্তির সাথে যুক্ত হচ্ছে বাড়তি খরচ। ভুক্তভোগীদের দাবি যতদ্রুত সম্ভব এই মেশিন চালু করে মানসম্মত সেবা দেওয়া।
সরেজমিন গত ৫,৬ ও ৭ জুলাই গিয়ে দেখা যায় হাসপাতালের নতুন ভবনের নিচতলায় তালাবদ্ধ ইকো ও ইটটি রুম। এর পাশেই চালু এক্সরে মেশিন। এক্সরে মেশিনের সেবা সবাই পেলেও পাচ্ছে না ইকো আর ইটিটি সেবা। ফলে রুমের সামনে ভিড়ও চোখে পড়ে না। সেখানকার দায়িত্বে থাকা টেকনিশিয়ানরাও অন্য বিভাগের দায়িত্বে। নতুন ভবনের পাঁচ তলায় রয়েছে কার্ডিওলজি বিভাগ। সেখানে দায়িত্বরত চিকিৎসক জানালেন গড়ে এই বিভাগে ১৫ থেকে ২০ জন রোগী ভর্তি থাকে। আর বহিঃবিভাগে হৃদরোগের লক্ষণ নিয়ে আসেন আরো ৫০ বা তারও অধিক রোগী। তাদের মধ্যে অনেকেরই ইকোকার্ডিওগ্রাফি করাতে হয়।
কার্ডিওলজি বিভাগে তিনদিন ধরে ভর্তি মো. কাশেম মিয়া। তার গ্রামের বাড়ি উলিপুর। তিনি বুকে ব্যাথা নিয়ে ভর্তি হয়েছেন এই হাসপাতালে। এখন পর্যন্ত দুই বার করিয়েছেন ইকোকার্ডিওগ্রাফি। চিকিৎসক পরামর্শ দিয়েছেন আরও একবার ইকোকার্ডিওগ্রাফি করাতে। দুবার এই পরীক্ষাতেই তার খরচ হয়েছে ২৯০০ টাকা। তবে সরকারিভাবে তার করতে খরচ হতো মাত্র ৫০০ টাকা। কাশেম মিয়া বললেন, ‘হাসপাতালে ভর্তি হইছি ঠিক, কিন্তু এখানে ঠিকমত চিকিৎসা পাই না। সব বাইরে গিয়ে করাতে হয়। আমি বুড়া মানুষ এই পাঁচ তালা ওঠা নামা করতেও কষ্ট হয়। পরীক্ষা দুইবার করাইছি তাতে খরচ গেছে মেলা টাকা। আরো একবার দিছে করবার।’ তার দাবি সরকারিভাবে এসব পরীক্ষার ব্যবস্থা করা।
একই অবস্থা কমল কান্তের। তিনিও বুকে ব্যথা নিয়ে ভর্তি হয়েছেন এখানে। রোগ নির্ণয়ের জন্য ভর্তি হয়েছেন এই সদর হাসাতালে। তাকেও চিৎিকসক পরামর্শ দিয়েছেন ইকোকার্ডিওগ্রাফি করাতে। তবে তিনি তা এখনো পর্যন্ত করাতে পারেন নি। মোটামোটি এই বিভাগের প্রায় সব রোগীকেই করাতে হয় এই পরীক্ষা।
কথা হয় পঞ্চাশোর্ধ্ব মাহফুজার রহমান রাজুর সঙ্গে, যিনি গত দুই বছর ধরে লড়ছেন হৃদরোগের সঙ্গে। বুক ব্যথা বাড়লেই করাতে হয় ইকো পরীক্ষা বা ইকোকার্ডিওগ্রাফি। তবে কুড়িগ্রামের ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালেই তিনি দেখতে পান তালাবদ্ধ ইকো ও ইটিটি পরীক্ষার কক্ষ। ফলে বাড়তি খরচ করে তাকে পরীক্ষা করাতে হয় বাইরে থেকে। তিনি আক্ষেপ করে বললেন, ‘আর কত বাইরে থেকে পরীক্ষা করাবো। কত টাকা খরচ করবে। কবে ঘুম ভাঙবে কর্তৃপক্ষের। আমরা এ থেকে নিস্তার চাই। সরকারিভাবে কম খরচে পরীক্ষা করাতে চাই।’
কুড়িগ্রাম ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের জুনিয়র কনসালটেন্ট মো. সাজ্জাদুর রহমান বললেন, ‘আমাদের ইকো ও ইটিটিরি জন্য দুজন ডাক্তার ও চারজন টেকনিশিয়ান রয়েছে। মেশিন সচল না থাকার কারণে আমরা রোগীদের ইকো করাতে পারছি না।’ তিনি আরো জানালেন এখানে ইকো করাতে পারলে রোগীদের ভোগান্তির সাথে কমবে খরচও।
হাসপাতালটির আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) নিসর্গ মেরাজ চৌধুরী বললেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমরা একাধিকবার চিঠি আদান-প্রদান করেছি, কিন্তু তেমন কোনো কাজই হয়নি। এটি চালু হলে এলাকার মানুষ স্বল্প খরচে ইকো ও ইটিটি সেবা পাবে। আমাদের চেষ্টার কোনো কমতি নেই। ইতোমধ্যে আমরা এন্ডোস্কোপি মেশিন চালু করেছি যা আগে বন্ধ ছিলো। আশা করি, খুব দ্রুত ইকো আর ইটটি মেশিনও চালু করতে পারবো।’


