আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে তখন চলছে ফুটবলের বিশুদ্ধ রোমাঞ্চ। খেলার ৫৮তম মিনিটে মিডফিল্ডার মোস্তফা জিকোর এক দুর্দান্ত একক প্রচেষ্টায় বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে প্রায় কোণঠাসা করে ফেলেছিল মিশর। স্কোরলাইন ২-০ হতে পারত, আফ্রিকার প্রতিনিধিরা মেতে উঠেছিল বন্য উল্লাসে। কিন্তু ডাগআউটের সেই আনন্দকে স্তব্ধ করে দিয়ে প্রযুক্তির রেফারি তথা ভিএআর যেন এক বজ্রপাত ঘটাল। দীর্ঘ চুলচেরা বিশ্লেষণের পর বাতিল হয়ে গেল মিসরের সেই জাদুকরী গোল। যুক্তি? গোলটির প্রায় ১০ সেকেন্ড আগে, মাঠের অন্য প্রান্তে আর্জেন্টিনার আক্রমণের সময় লিসান্দ্রো মার্তিনেসকে ফাউল করেছিলেন মিসরের মারওয়ান আতিয়া।
কিন্তু এই সিদ্ধান্তই এখন রূপ নিয়েছে এক বিশাল বিতর্কে। ভিএআর কি এখানে তার ক্ষমতার অতিরিক্ত প্রয়োগ করেছে? মাঠের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের ঘটনা, যা প্রায় ১০০ গজ দূরের–তা নিয়ে গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারছেন না অনেক ফুটবল বিশ্লেষক।
‘এটি ভিএআরের এখতিয়ারে পড়ে না’
ফক্স স্পোর্টসের বিশ্লেষক রব গ্রিন সম্প্রচার চলাকালীনই এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, ‘আর্জেন্টিনার জন্য কী দারুণ এক স্বস্তি! মাঠের পুরো এক প্রান্ত দূরত্বে, ১০০ গজ দূরে কেউ একজন কারও পায়ে পাড়া দিয়েছে, আর এই কারণে ভিএআরকে খেলায় টানা হলো? আমরা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছি যেখানে ভিএআর তার ক্ষমতার সীমানা ছাড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত হাত বাড়িয়েছে। রেফারি তো ট্যাকলটি মাঠে দেখেই খেলা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। মিসরের একটি চমৎকার কাউন্টার-অ্যাটাক গোল থেকে তাদের দুই গোলের ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ এভাবে কেড়ে নেওয়া হলো।’
সাবেক বিখ্যাত ফিফা রেফারি এবং ফুটবল নিয়ম বিশ্লেষক মার্ক ক্ল্যাটেনবার্গও এই হস্তক্ষেপের সঙ্গে সম্পূর্ণ দ্বিমত পোষণ করেছেন। ম্যাচ শেষে তিনি সরাসরি ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি না যে প্রথমত এটি কোনো ফাউল ছিল এবং দ্বিতীয়ত এই গোলটি বাতিল করার জন্য ভিএআরের হস্তক্ষেপ করা উচিত ছিল। এটি ভিএআরের নেওয়ার মতো কোনো সিদ্ধান্তই নয়।’
ক্ল্যাটেনবার্গ এই বিশ্বকাপে রেফারিংয়ের ধারাবাহিকতার অভাবের দিকে আঙুল তুলে বলেন, এই টুর্নামেন্টে রেফারিরা বেশ কিছু শারীরিক সংস্পর্শ ও চ্যালেঞ্জের অনুমতি দিচ্ছেন।
তিনি যোগ করেন, ‘ফাউল থেকে গোল হওয়া পর্যন্ত সময়টা ছিল প্রায় ১০ সেকেন্ড। এই দীর্ঘ সময়ে আর্জেন্টিনা নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ পেয়েছিল। মিসরের গোলটি বাতিল করার জন্য ভিএআর খেলার ভেতরের ঘটনাকে বড্ড বেশি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল। বিশ্বের অনেক মানুষই এটিকে আর্জেন্টিনার পক্ষে একটি অন্যায্য সুবিধা এবং বিতর্কিত হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখবে।’
‘এটি প্রোটোকল মেনে হয়েছে’
তবে এই তুমুল সমালোচনার বিপরীতে দাঁড়িয়ে ভিএআরের সিদ্ধান্তকে যৌক্তিক ও নিয়মসম্মত বলে দাবি করেছেন ফক্স স্পোর্টসের ফুটবল রেফারিং বিশেষজ্ঞ ডক্টর জো মাচনিক।
‘ওয়ার্ল্ড কাপ নাও’ অনুষ্ঠানে তিনি ব্যাখ্যা করেন, গোলদাতা দলের নিয়ন্ত্রণে বল আসার ঠিক আগের আক্রমণাত্মক ধাপে যদি কোনো ফাউল থাকে, তবে দূরত্ব বা সময় মুখ্য নয়; গোল বাতিল হতেই পারে।
মাচনিকের মতে, ‘ভিএআর প্রোটোকলে কোনো নির্দিষ্ট দূরত্ব বা সেকেন্ডের উল্লেখ নেই। রেফারি যে অ্যাঙ্গেলে ছিলেন, ঘটনাটি মাঠের এক কোণায় হওয়ায় তিনি হয়তো পরিষ্কার দেখতে পাননি। সহকারী রেফারিও ছিলেন দূরে। তাই ভিএআর ভিন্ন কোণ থেকে ফাউলটি দেখিয়েছে। তবে হ্যাঁ, আমরা এটি পছন্দ করি না। প্রায় ৭৫ শতাংশ সময় ভিএআর ফুটবল থেকে আনন্দের মুহূর্ত কেড়ে নেয় এবং বাকি ২৫ শতাংশ সময় এটি আমাদের সামনে কুৎসিত ও বেদনাদায়ক কিছু হাজির করে।’
‘আমরা অবিচারের শিকার’
ভিএআরের এই সিদ্ধান্তের পর খেলার ৬৭ মিনিটে জিকো আবার গোল করে মিশরকে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে নিলেও শেষ দিকে আর্জেন্টিনা ৩-২ গোলে ম্যাচটি জিতে নেওয়ায় এই বাতিল হওয়া গোলটিই ম্যাচের ভাগ্যনির্ধারক হয়ে দাঁড়ায়।
ম্যাচ শেষে মিসরের কোচ হোসাম হাসান ক্ষোভ ও বুকভরা কষ্ট চেপে রাখতে পারেননি। এপির মাধ্যমে তিনি নিজের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, ‘আমি এই ফলাফলে এবং ম্যাচে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোতে মোটেও সন্তুষ্ট নই। আমি এখানে সুন্দর শব্দ ব্যবহার করে বিষয়টিকে হালকা করতে চাই না, কিংবা একে ‘দুর্ভাগ্য’ বলতে চাই না। আমাদের সঙ্গে চরম অন্যায় করা হয়েছে। আমরা স্পষ্ট অবিচারের শিকার হয়েছি।’
আটলান্টার এই রোমাঞ্চকর রাত যেমন আর্জেন্টিনার মহাকাব্যিক প্রত্যাবর্তনের সাক্ষী হয়ে থাকবে, তেমনি ‘ভিএআর’ নামক আধুনিক ফুটবল-প্রযুক্তির সীমানা ও বিতর্ককেও আরও একবার প্রকাশ্য আদালতে দাঁড় করিয়ে দিল।


