ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সরকারি ওয়েবসাইট থেকে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় তথ্য মুছে ফেলার অভিযোগ উঠেছে ধারাবাহিকভাবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই প্রবণতা নাগরিকদের তথ্য জানার অধিকার সংকুচিত করছে এবং প্রশাসনে স্বচ্ছতা দুর্বল করছে।
তাদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে এই ধারা শুরু হয় এবং পরবর্তী সরকারগুলোও একই পথ অনুসরণ করেছে। এক সরকারের সময় প্রকাশিত তথ্য পরবর্তী সরকার এসে সরকারি ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার প্রথমে আওয়ামী লীগ আমলে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে দেয়। প্রায় ২৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বার্ষিক প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন নথি তখন মুছে ফেলা হয়।
এখন সমালোচকদের অভিযোগ, বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রকাশিত তথ্য সরানো শুরু করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধারা চলতে থাকলে সরকারি নীতি, সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রম সম্পর্কে নাগরিকদের তথ্য পাওয়ার অধিকার গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে জবাবদিহি কমে যাবে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা কঠিন হয়ে উঠবে।
বিষয়টি রোববার ঢাকায় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপন করা হয়।
টিআইবি নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বর্তমান সরকার সরিয়ে দিচ্ছে।
তিনি বলেন, সরকারি ওয়েবসাইট থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এর দায় বর্তমান সরকারের। তারা এটি করতে পারে না। তথ্য সঠিক হোক বা ভুল-রাষ্ট্রের পক্ষে হোক বা বিপক্ষে নাগরিকদের সব তথ্য জানার অধিকার আছে।
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সংক্রান্ত বেশ কিছু সিদ্ধান্ত ও নথি ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে, ফলে সেগুলো এখন আর অনলাইনে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, যোগ করেন তিনি।
ইফতেখারুজ্জামান এ ধরনের তথ্য অপসারণের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।
তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারও এর আগে ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত সময়ের বিভিন্ন নথি সরকারি ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে দিয়েছিল, যখন শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
অধিকারকর্মীরা বলছেন, সরকারি নথি মুছে ফেলা ২০০৯ সালের তথ্য অধিকার আইনের চেতনার পরিপন্থী, যার উদ্দেশ্য ছিল নাগরিকদের তথ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা।
রিসার্চ ইনিশিয়েটিভস বাংলাদেশ উপপরিচালক রুহি নাজ বলেন, সরকারি ওয়েবসাইট থেকে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় তথ্য সরিয়ে ফেলা আইনি বাধ্যবাধকতার লঙ্ঘন হতে পারে।
তিনি বলেন, সরকার অনেক সময় বলে, আগের সরকার ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বলে তথ্য সরানো হয়েছে।
কিন্তু এর পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে। এটি অজ্ঞতার কারণে হতে পারে, আবার ইচ্ছাকৃতভাবেও হতে পারে, কারণ তারা হয়তো চায় না সেই নথিগুলো ওয়েবসাইটে থাকুক। রাজনৈতিক কারণও থাকতে পারে, তিনি যোগ করেন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, সরকারি তথ্য মুছে ফেলা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রেরই ক্ষতি করতে পারে। এতে একদিকে শাসনব্যবস্থার স্বচ্ছতা কমে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে আগের সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
অন্তর্বর্তী সরকার যখন আওয়ামী লীগ আমলের তথ্য সরায়, তখন প্রায় ২৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের গত ১৫ বছরের বার্ষিক প্রতিবেদনও মুছে ফেলা হয়।
বার্ষিক প্রতিবেদনে সাধারণত একটি মন্ত্রণালয়ের অর্থবছরভিত্তিক কার্যক্রম, নীতি, পরিকল্পনা, অর্জন, অর্থ বরাদ্দ এবং আগের বছরের সঙ্গে তুলনামূলক তথ্য থাকে।
সাংবাদিক ও গবেষকদের মতে, সরকারের কার্যক্রম ও নীতির ধারাবাহিকতা বোঝার জন্য এসব প্রতিবেদন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
টাইমস অব বাংলাদেশ-এর পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ৫৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ওয়েবসাইটের অনেকগুলোতেই এখন খুব সীমিত তথ্য রয়েছে বা কিছু অংশ প্রায় খালি।
এর মধ্যে পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা, রেলপথ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে বিভিন্ন তথ্য অনুপস্থিত রয়েছে।
একই ধরনের ঘাটতি দেখা গেছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, সেতু বিভাগ এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের ওয়েবসাইটেও।
তথ্য অপসারণের প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরপরই।
প্রথমদিকে ওয়েবসাইটগুলো থেকে শেখ হাসিনা এবং দেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের প্রোফাইল, ছবি ও ভিডিও সরিয়ে ফেলা হয়।
তবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী, তার মন্ত্রিসভার সদস্য এবং দলীয় নেতাদের সংশ্লিষ্ট অনেক নথি তখনও বিভিন্ন সরকারি ওয়েবসাইটে থেকে যায়।
এর প্রেক্ষিতে চলতি বছরের ২৪ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ই-গভর্ন্যান্স শাখা একটি পরিপত্র জারি করে।
সিনিয়র সহকারী সচিব শেখ জোবায়ের আহমেদ স্বাক্ষরিত ওই পরিপত্রে বলা হয়, বাংলাদেশ ন্যাশনাল পোর্টালের অধীন অনেক ওয়েবসাইটে এখনও আগের সরকারের ‘অপ্রয়োজনীয় ও প্রশংসামূলক তথ্য, ছবি ও ভিডিও’ রয়ে গেছে।
পরিপত্রে বলা হয়, অনেক ওয়েবসাইট হালনাগাদ না থাকায় নাগরিকদের তথ্যপ্রাপ্তি ব্যাহত হচ্ছে এবং সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সেই নির্দেশনায় মন্ত্রণালয় থেকে ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত সব সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট হালনাগাদ করার কথা বলা হয়, যা সমালোচকদের মতে কার্যত এসব তথ্য সরিয়ে ফেলার নির্দেশনা।
এরপর রাষ্ট্রপতির কার্যালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, আইন ও সংসদবিষয়ক বিভাগ এবং পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের ওয়েবসাইটের বিভিন্ন নথি সরানো হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকার হোক বা বর্তমান সরকার-রাষ্ট্রীয় নথি মুছে ফেলা সমানভাবে উদ্বেগজনক।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, তিনি অভিযোগগুলোর বিষয়ে এখনো অবগত নন। ‘আমি এখনই বিষয়টি শুনলাম। বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলতে হবে,’ যোগ করেন তিনি।


