সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে যখন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বাদানুবাদ চলছে তখন বিএনপি ভাবতে বসেছে কোন আসনে কাকে প্রার্থী ঘোষণা করা যেতে পারে।
জামায়াত বা এনসিপির সঙ্গে লড়াই নয় বরং এ মুহূর্তে বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একক প্রার্থী বাছাই।
প্রতিটি আসনে দলের একাধিক যোগ্য প্রার্থী থাকায় কাকে শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন দেওয়া হবে তা চূড়ান্ত করতে হিমশিম খাচ্ছেন শীর্ষ নেতারা। দলের ভেতরে থাকা কোন্দল, মনোনয়ন না দিলে বিদ্রোহী হওয়ার শঙ্কা এবং সমমনা দলগুলোকে আসন ছেড়ে দেওয়ার বিষয়গুলো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
দীর্ঘ ১৯ বছর বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে। সবশেষ ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৯৩ আসনে জয় পেয়ে সরকার গঠন করেছিল দলটি। মেয়াদ শেষে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর সাবেক রাষ্ট্রপতি ও তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে বিএনপি। এরপর আর ক্ষমতায় আসতে পারেনি দলটি।
ফলে ‘আওয়ামী লীগবিহীন’ আগামী নির্বাচনকে বিএনপির জন্য ক্ষমতায় ফিরে আসার বড় সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আর সে কারণেই প্রার্থী দেওয়ার ক্ষেত্রে এবার অনেক সতর্ক বিএনপি। বিতর্কিত বা যোগ্য নন কিংবা জনবিচ্ছিন্ন কাউকে মনোনয়ন দিয়ে আসন খোয়াতে চায় না দলটি।
ফলে ৩০০ আসনে একক প্রার্থী চূড়ান্ত করতে সময়সাপেক্ষ এবং জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে বিএনপিকে।
দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এরই মধ্যে প্রায় ২০০ আসনের প্রার্থী চূড়ান্ত করা গেছে। বাকি ১০০ আসন নিয়ে রয়েছে নানা মত, রয়েছে দোদুল্যমানতা।
বিএনপির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এ মুহূর্তে খুব সুবিধাজনক নয়। বিশেষ করে যেসব আসনে একাধিক যোগ্য প্রার্থী রয়েছেন, সেখানে দলীয় কোন্দল বেড়েই চলেছে।
২০১৮ সালে সবশেষ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল বিএনপি। সেবার যেসব বিএনপি নেতা নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পাননি তাদের অনেকেই বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে ভোটের লড়াইয়ে ছিলেন। তারাও এবার বিএনপির মনোনয়ন চান। তাই স্বাভাবিকভাবেই আসনগুলোয় মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে নেতাদের মধ্যে সংশয় তৈরি হয়েছে, সৃষ্টি হয়েছে কোন্দল।
আবার ঢাকার আসনগুলোর মতো সারা দেশেই বেশকিছু জ্যেষ্ঠ বা প্রয়াত নেতার পরিবারের মধ্যে একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী রয়েছেন। এমনও আসন আছে যেখানে একই আসনে বাবা ও ছেলে কিংবা মা ও ছেলে মনোনয়ন চাইছেন, যা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে।
এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার অবশ্য মনোনয়ন বোর্ডের হাতে ন্যাস্ত করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ‘একটি পরিবারে একাধিক যোগ্য প্রার্থী থাকলে, মনোনয়ন বোর্ড তাদের মধ্যে একজনকে চূড়ান্ত করবে।’
মনোনয়ন চূড়ান্ত করতে যে ১০০ আসন বাকি রয়েছে সেখান থেকে মিত্র ও সমমনা দলগুলোর জন্য কিছু আসন ছাড়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অবশ্য মিত্র দলগুলোর জন্য কোন কোন আসন ছেড়ে দেওয়া হবে তা নিয়ে দলের ভেতরেই রয়েছে ভিন্নমত।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘দলের মধ্যে একাধিক যোগ্য প্রার্থী রয়েছে, আমরা তৃণমূলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এবং জরিপের মাধ্যমে একজন প্রার্থী চূড়ান্ত করব।’
কেমন প্রার্থী বেছে নিচ্ছে বিএনপি; তা জানতে কথা হয় বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে।
তারা বলছেন, প্রার্থীদের মধ্যে যারা তরুণ এবং জনগণের কাছে জনপ্রিয়, তাদের দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে। যারা নির্বাচনী এলাকায় কাজ করছেন, গত ১৯ বছর যারা জনগণের মধ্যে থেকেছেন তাদেরকেই প্রার্থী করতে চায় বিএনপি। তরুণদের প্রাধান্য দিতে গিয়ে জ্যেষ্ঠ নেতাদের কেউ কেউ বাদ পড়তে পারেন, এমন ইঙ্গিতও মিলেছে।
দলের শীর্ষ নেতারা বলছেন, গত ১৯ বছর দলের নেতাকর্মীদের অনেক বাধা-বিপত্তি পেরোতে হয়েছে। বেশিরভাগের মাথায় অসংখ্য মামলা, অনেকে জেলে গিয়েছেন, সাজা খেটেছেন। অনেক নেতাই গুম-খুনের শিকার হয়েছেন। ফলে, এসব নেতাদের পরিবারেও একাধিক যোগ্য প্রার্থী তৈরি হয়েছে।
চলতি অক্টোবরের মধ্যেই ২০০ আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করার কথা জানিয়েছেন দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য অবসরপ্রাপ্ত মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদ।
তিনি বলেন, ‘ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ব্যক্তিগতভাবে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্য থেকে জরিপের মাধ্যমে একক প্রার্থী চূড়ান্ত করবেন।’
বিগত নির্বাচনগুলোয় মনোনয়ন দেওয়াও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের জন্য এক ধরনের পরীক্ষার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেসব মনোনয়ন নিয়েও উঠেছিল বিতর্ক। তাই এবার সব ধরনের জটিলতা ও রাজনৈতিক কোন্দল মিটিয়ে মনোনয়ন চূড়ান্ত করার দিকে মনোযোগ দিয়েছে বিএনপি। সেইসঙ্গে খোলা রাখতে হচ্ছে শরিকদের সঙ্গে আলোচনার দরজাও।
সব সংকট কাটিয়ে বিএনপি এমনভাবে প্রার্থী চূড়ান্ত করতে চায় যারা রাষ্ট্র মেরামতে দলের ৩১ দফার সঙ্গে একাত্ম হতে পারবেন। যারা জনগণের সঙ্গে থেকে তাদের ভাষা বুঝতে পারবেন এবং সে অনুযায়ী কাজ করতে পারবেন।


