বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার বর্তমান প্রেক্ষাপট অত্যন্ত জটিল ও বৈচিত্র্যময়। এক দিকে সরকারি ব্যবস্থায় সাধারণ ও আমলা নির্ভর শিক্ষা চালু আছে, অন্যদিকে টেকনিক্যাল, প্রযুক্তি ও মাদ্রাসাশিক্ষার চাহিদা বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে চার ধরনের ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন—শিক্ষানুরাগী, শিক্ষাবিদ, শিক্ষা উদ্যোক্তা ও শিক্ষা ব্যবসায়ী। এঁদের প্রত্যেকের অবস্থান, লক্ষ্য ও প্রভাব আলাদা, কিন্তু উচ্চশিক্ষার প্রসারে এঁদের সম্মিলিত অগ্রযাত্রা অপরিহার্য।
শিক্ষানুরাগী: মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির কারিগর
শিক্ষানুরাগী সেই ব্যক্তি, যিনি লাভের চেয়ে জ্ঞান ও সমাজসেবাকে প্রাধান্য দেন। তিনি সাধারণত ব্যক্তি উদ্যোগে বা দাতব্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। পুরোনো আমলের ধনীক শ্রেণির মতো তিনিও নিজের বা সমবেত অর্থ বিনিয়োগ করেন, কিন্তু বিনিময়ে প্রত্যক্ষ মুনাফা প্রত্যাশা করেন না। সারাদেশে কিছু পুরনো কলেজ বা ঢাকার কয়েকটি মিশনারি প্রতিষ্ঠান এর উদাহরণ। এঁদের ভূমিকা হলো শিক্ষার দোরগোড়ায় যেন কেউ বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করা। করোনাকালে বা দুর্যোগে যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের বেতন ছাড় দিয়েছে বা অনলাইন ক্লাস বিনামূল্যে চালিয়েছে, সেখানে অনেক শিক্ষানুরাগীর ভূমিকা ছিল।
শিক্ষাবিদ: জ্ঞানের নতুন দিগন্ত সন্ধানী
শিক্ষাবিদ মূলত গবেষক, তত্ত্ববিদ ও পাঠ্যপুস্তক রচয়িতা। তিনি উচ্চশিক্ষার গুণগত মান ঠিক রাখার চেষ্টা করেন। তাঁর ভূমিকা হলো নতুন তত্ত্ব আবিষ্কার, নৈতিক চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করা এবং শিক্ষাকে যন্ত্রসর্বস্বতার বাইরে নিয়ে যাওয়া। বৈশ্বিক উষ্ণতা বা কোভিড-পরবর্তী মানসিক সংকট মোকাবেলায় শিক্ষাবিদরাই নতুন পাঠক্রম ও গবেষণার দিক নির্ধারণ করেন। বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে শিক্ষাবিদদের উপস্থিতি জরুরি। সমস্যা হলো, শিক্ষাবিদদের অনেকেই প্রশাসনিক বা ব্যবসায়িক কাজে জড়িয়ে পড়ায় প্রকৃত গবেষণায় সময় পান কম।
শিক্ষা উদ্যোক্তা: উদ্ভাবন ও সমাধানের ফেরিওয়ালা
শিক্ষা উদ্যোক্তা লাভমুখী হলেও সামাজিক প্রভাবকে গুরুত্ব দেন। তিনি নতুন ধরনের প্রযুক্তি, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র বা হাইব্রিড শিক্ষা মডেল চালু করেন। বাংলাদেশে ‘টেন মিনিট স্কুল’, ‘শিখো’ বা ‘রবি প্রোগ্রামিং ক্যাম্পাস’-এর মতো উদ্যোগ শিক্ষা উদ্যোক্তাদের তৈরি। এঁরা সরকারি সক্ষমতার বাইরে প্রান্তিক শিক্ষার্থীর কাছে মানসম্পন্ন বিষয়বস্তু পৌঁছে দিতে পারেন। চ্যালেঞ্জ হলো, দেশের ইন্টারনেট ও বিদ্যুৎ সুবিধা অসম, ফলে অনেক উদ্যোগই নগরকেন্দ্রিক থাকে।
শিক্ষা ব্যবসায়ী: শাসন ও সম্প্রসারণের রূপকার
শিক্ষা ব্যবসায়ী অনেকটা কৌশলী। তিনি শিক্ষাকে শিল্প হিসেবে দেখেন। তার লক্ষ্য বেশি প্রতিষ্ঠান, বেশি শিক্ষার্থী ও অর্থের টার্নওভার। বর্তমানে বাংলাদেশে শত শত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ ও ক্যামব্রিয়ান কারিকুলাম স্কুল শিক্ষা ব্যবসায়ীদের হাতে পরিচালিত। সমালোচনা থাকলেও, এগুলো ছাড়া বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার বাইরে থাকত। এঁদের দায়িত্ব হলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। যে প্রতিষ্ঠান ‘মানবসেবায় দীক্ষিত’ দাবি করে, সেখানে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ যেন শিক্ষার্থীর ক্ষতি না করে, সেদিকে নজর দিতে হবে।
প্রাসঙ্গিক চ্যালেঞ্জ ও করণীয়
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই চার ভূমিকার মাঝে প্রায়ই সংঘাত দেখা যায়। শিক্ষানুরাগী হঠাৎ বিদায় নিলে প্রতিষ্ঠান চলে যায় ব্যবসায়ীর হাতে। আবার শিক্ষাবিদের তত্ত্বকে উদ্যোক্তারা বাস্তবসম্মতভাবে কাজে লাগাতে না পারলে উদ্ভাবন আটকে যায়। যে প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো পুরনো আমলের ধনীক শ্রেণি বা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সংগৃহীত চাঁদার অর্থ দিয়ে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আজ কীভাবে কার্যকর ভূমিকা রাখবে?
এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ট্রাস্টি বোর্ডে শিক্ষাবিদ ও অনুরাগীদের সংখ্যা বাড়ানো, শিক্ষা ব্যবসায়ীদের উপস্থিতিতে স্বচ্ছ তহবিল ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা উচিত। শিক্ষা উদ্যোক্তাদের সঙ্গে যৌথ গবেষণা চালু করে স্থানীয় সমস্যার সমাধান বের করা, নৈতিক চরম অধঃপতন ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার মতো বড় চ্যালেঞ্জে শিক্ষার্থীদের গবেষণায় উৎসাহিত করা যেতে পারে।
শিক্ষা মৌলিক অধিকার—এ কথা বলা হলেও বাস্তবে সরকার একা সব করতে পারে না। তাই শিক্ষানুরাগী, শিক্ষাবিদ, উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী—এই চার স্তম্ভকে সমন্বিত নীতি ও নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগোতে হবে। তবেই করোনা থেকে বৈশ্বিক উষ্ণতা, নৈতিক পতন থেকে প্রযুক্তিগত টেকসই সমাধান—সব মোকাবেলা সম্ভব হবে।
লেখক: ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, ডেইলি টাইমস অব বাংলাদেশ


