কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরে জুমার নামাজ শেষে বের হওয়ার সময় এক বাংলাদেশি যুবককে লক্ষ্য করে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা গুলি চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জমি নিয়ে বিরোধ, বকেয়া টাকা-পয়সার লেনদেন ও পূর্বশত্রুতার জেরে এ ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
ঘটনায় ওবাইদুল হক লালু (৩০) নামের এক বাংলাদেশি যুবক গুরুতর আহত হয়েছেন। তিনি বর্তমানে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে তার মা সাইরা খাতুন জানিয়েছেন।
শুক্রবার দুপুর ১টা ৪০ মিনিটের দিকে উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ১৪ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সি-২ ব্লকে অবস্থিত মসজিদে সুন্নাহর সামনে এ ঘটনা ঘটে।
আহত ওবাইদুল হক পালংখালী ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের চোরখোলা এলাকার আবুল হোছেন প্রকাশ ভুলুর ছেলে। তিনি স্থানীয়ভাবে ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে উখিয়ার কুতুপালং এমএসএফ হাসপাতালে নিয়ে যান। পরবর্তীতে চিকিৎসকরা উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পাঠান।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জুমার নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় ওবাইদুল হক লালুর সঙ্গে রোহিঙ্গা ও আরএসও কমান্ডার মোহাম্মদ ইউনুস (৩৫) এবং তার সঙ্গীদের বিরোধ সৃষ্টি হয়।
স্থানীয়দের দাবি, ইউনুস নিজেকে আরএসও-সংশ্লিষ্ট কমান্ডার হিসেবে পরিচয় দেন। তার সঙ্গে হেড মাঝি আমানুল্লাহ, সাইট মাঝি সব্বির আহমদ, চাকমা ওসমান, মোহাম্মদ হারুন ও মোহাম্মদ ফারুকসহ কয়েকজন ছিলেন। একপর্যায়ে অস্ত্রধারীরা ওবাইদুলকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এতে তার ডান পায়ের গোড়ালিতে গুলি লাগে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে প্রায় পাঁচ রাউন্ড গুলির শব্দ শোনা যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গুলির পর অস্ত্রধারীরা ক্যাম্পের কাঁটাতারের অংশ অতিক্রম করে বাংলাদেশি বসতিপূর্ণ এলাকায় ঢুকে পড়ে। এতে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
আহত ওবাইদুলের বড় ভাই জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমার ভাই মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় হঠাৎ তাকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। এতে সে পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার চাই।’
স্থানীয় বাসিন্দা সিরাজ মিয়া বলেন, ‘জুমার নামাজের পর রোহিঙ্গা আরএসও সদস্যরা অস্ত্রসহ এসে হঠাৎ গুলি করতে করতে কাঁটাতার পেরিয়ে বাংলাদেশিদের বাড়ির উঠানে চলে আসে। পরে উখিয়া থানা-পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে এলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।’
আরেক বাসিন্দা নুর আয়েশা অভিযোগ করেন, ‘রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা রাতে আবারও হামলা করার হুমকি দিচ্ছে। আমরা সরকারের কাছে নিরাপত্তা চাই।’
পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘ক্যাম্পের ভেতরে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে অবৈধ অস্ত্র ও গুলি উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও কঠোর অভিযান চালানোর দাবি জানাচ্ছি।’
উখিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আরমান আজাদ বলেন, ‘১৪ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কাঁটাতারের পাশে একটি মসজিদের সামনে স্থানীয় এক বাংলাদেশি দোকানদারকে লক্ষ্য করে সশস্ত্র রোহিঙ্গারা গুলি করেছে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। ঘটনার কারণ উদ্ঘাটন, ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার এবং জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।’
৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক রিয়াজ উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের ছোড়া গুলিতে এক বাংলাদেশি ব্যবসায়ী আহত হয়েছেন। ঘটনার পরপরই নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।’
কাঁটাতারসংলগ্ন এলাকায় গুলিবর্ষণের ঘটনা এবং ক্যাম্পের ভিতর থেকে অস্ত্র নিয়ে বাংলাদেশি বসতিপূর্ণ এলাকায় প্রবেশের অভিযোগের পর ক্যাম্প ও স্থানীয় বসতির নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।


