ইসলামী ব্যাংক ধ্বংস করার নানা ষড়যন্ত্র চলছে বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম। তিনি বলেছেন, ‘ইসলামী ব্যাংক ধ্বংস হওয়ার দায় বিএনপি সরকারের ওপর পড়ুক, তা আমরা চাই না।’
শনিবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের মওলানা আকরম খাঁ হলে ‘ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বন্ধ, আর্থিক নিরাপত্তা ও গ্রাহকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় করণীয়’ শিরোনামে এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
আব্দুল হালিম বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংক ধ্বংস করার জন্যে নানামুখী ষড়যন্ত্র আছে। আমরা চাই না ইসলামী ব্যাংক ধ্বংস হওয়ার দায় বিএনপি নেবে বা মানুষ মনে করবে যে বিএনপি সরকারের নেতৃত্বে ইসলামী ব্যাংক ধ্বংস হয়েছে।’
ব্যাংকিং খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংক দেশের সব মানুষের এবং সব রাজনৈতিক দলের গ্রাহকদের অবদানে বর্তমান অবস্থানে পৌঁছেছে। তাই ব্যাংকটিকে রাজনৈতিক বিবেচনায় দেখা উচিত নয়। দল-মত নির্বিশেষে এই ব্যাংক রক্ষা করা সবার দায়িত্ব।’
ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে জামায়াতের একচ্ছত্র সম্পর্ক রয়েছে এমন ধারণার সমালোচনা করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘ব্যাংকটিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ কাজ করেন। আমি নাম ধরে উদাহরণ দিতে পারব, আওয়ামী লীগের পরিবারের সদস্যও ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তা আছেন। একজন নাগরিক যদি তার যোগ্যতা, শিক্ষা ও চারিত্রিক দৃঢ়তার কারণে কোনো ব্যাংকের কর্মকর্তা হন, তাকে জামায়াত বলে গালি দেবেন কেন?’
তিনি দাবি করেন, ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ব্যবসায়ী ও গ্রাহক উপকৃত হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ইতিহাস দেখেন, এই ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ বিভিন্ন দলের লোকেরা ব্যবসা করেছেন ও লাভবান হয়েছেন।’
২০১৭ সালের ব্যাংক দখলের সমালোচনা
আলোচনা সভায় ২০১৭ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের ঘটনাও তুলে ধরেন আব্দুল হালিম। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘২০১৭ সালে রাতের অন্ধকারে নয়, দিনের বেলায় ব্যাংক দখল হয়েছে। ব্যাংকের মিটিং হওয়ার কথা ছিল দিলকুশায়, কিন্তু সব আয়োজন ও বৈঠক হয়েছে হোটেল রেডিসনে। ব্যাংকের এমডিকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘যে সরকার এটা করে গেছে, সেই সরকার তো দুপুরের খাওয়া ছাড়া পালিয়ে গেছে। তারা ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার করেছে। বিএনপি সরকার তাদের অনুসরণ করবে কেন?’
ব্যাংকটিকে সংকটে ফেলার জন্য শিল্পগোষ্ঠী এস আলমকে দায়ী করে তিনি বলেন, ‘বিগত সরকারের মদদে ব্যাংকটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।’ তার ভাষ্য, ‘যে ব্যক্তি ব্যাংক থেকে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়েছে, এখন ব্যাংক শেষ করার নেতৃত্বে দিয়ে তিনি পালিয়ে গেছেন।’
বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংকের নেতৃত্বে কোনো রাজনৈতিক দলের লোক নয়, বরং যোগ্য, দক্ষ ও সৎ ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া উচিত।’
‘আগে বাংলাদেশ’
দেশকে দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আব্দুল হালিম বলেন, ‘আগে বাংলাদেশ।’ তিনি বলেন, অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় হতে পারে না এবং মাদক, ধর্ষণ ও অন্যান্য অসামাজিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সব রাজনৈতিক দলের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন।
ইসলামী ব্যাংকের প্রায় তিন কোটি গ্রাহকের স্বার্থের কথা উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করেন, ব্যাংকটির বিষয়ে সরকারের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত সঠিক না হলে গ্রাহকদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে রেমিট্যান্স প্রবাহ ও দেশের আর্থিক খাতের স্বার্থে ইসলামী ব্যাংককে আগের অবস্থানে ফিরিয়ে আনার দাবি জানান তিনি।
এ সময় নাগরিক মঞ্চের প্রধান সমন্বয়কারী এবং দেশপ্রেমিক নাগরিক পার্টির চেয়ারম্যান আহসান উল্লাহ শামীম বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংকের ওপর কোনো ধরনের অবৈধ হস্তক্ষেপ করা উচিত হবে না। অন্যথায় এর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকারের মেয়াদের কয়েক মাস অতিবাহিত হলেও জনগণের জন্য উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্য দৃশ্যমান হয়নি। বিপরীতে বিভিন্ন স্থানে লুটপাট, ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। সরকার ব্যর্থ হলে জনগণ আবারও আন্দোলনের পথে নামতে পারে।’
সরকারকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘সরকার আমাদের শত্রু নয়, বন্ধু। তবে ইসলাম ও ইসলামী ব্যাংকের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপ প্রত্যাহার না করা হলে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।’
একই সঙ্গে সরকারের ভালো কাজের প্রশংসা এবং অন্যায় কাজের প্রতিবাদ অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।


