বাংলাদেশে গত এক দশকে জাতীয় মাছ ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। অথচ এক বছরেই ইলশের দাম বেড়েছে দ্বিগুনেরও বেশি। খোদ সরকারি তথ্য থেকেই জাতীয় মাছের এমন দাম বাড়ার চিত্র পাওযা গেছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে ২০১৩-১৪ সালে ইলিশের উৎপাদন ছিল ৩ লাখ ৮৫ হাজার টন। ২০২৩-২৪ সালে উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ২৯ হাজার টনে। কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) তথ্য অনুসারে, এক দশক আগে এক কেজি ওজনের ইলিশের দাম ছিল এক হাজার টাকা। এ বছর ঢাকার বাজারে এক কেজি ওজনের ইলিশের দাম ২ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। আর ছোট সাইজের ইলিশের দাম বেড়েছে প্রায় তিন গুণ। অর্থনীতির সাধারণ সূত্র অনুসারে সরবরাহ বাড়লে দাম কমে। কিন্তু জাতীয় মাছের বেলায় ঘটেছে উল্টো।
উৎপাদন ও দামের এই বিপরীত চিত্রের কারণে উৎপাদনের সরকারি হিসাব নিয়ে সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইলিশ মাছ ধরার সঙ্গে জড়িতরা বলছেন, সরকারের উৎপাদন তথ্য তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেলে না। তারা মনে করেন উৎপাদন পরিসংখ্যান প্রকাশের বিষয়টি আমলাতান্ত্রিক কারসাজির সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমবায় সমিতির সভাপতি আব্দুল বারি জমাদার মানিক বলেন, ‘মৎস্য অফিস থেকে কেউ আমাদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে না। তারা কেবল ঢাকাতে অনুমান করে তথ্য পাঠায়। আমরা জানি না, সেগুলো কীভাবে সরকারি হিসাব তৈরি হয়।’
কিছু ক্ষেত্রে, যে নদীগুলোতে বহু বছর ধরে ইলিশ নেই, সরকার সেখানেও ইলিশ ধরার তথ্য প্রকাশ করে। মানিক আরও যোগ করেন, ‘তারা বলে চাঁদপুরের ধনগোদা নদীতে ইলিশ আছে। কিন্তু সেখানে ইলিশের দেখাই মেলে না।’
জেলে, ব্যবসায়ী এবং বিশ্লেষকদের কাছে, এই ধরনের অসংগতি ইলিশের উৎপাদন নিয়ে সাফল্যের গল্প প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
কীভাবে তৈরি হয় সরকারি হিসাব
ইলিশ উৎপাদনের হিসাব কীভাবে তৈরি হয় তা জানতে ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’ ইলিশের জন্য নির্ধারিত বেশ কয়েকটি অভয়াশ্রম পরিদর্শন করেছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব এলাকায় খাপছাড়াভাবে তথ্য সংগ্রহ করে মৎস্য অধিদপ্তর। কোনো কোনো কর্মকর্তা যথেচ্ছ নমুনার ওপর নির্ভর করেন, কেউ কেউ স্থানীয় ব্যবসায়ী বা জেলেদের সাক্ষাৎকার নেন, আবার কেউ কেউ কেবল একটি নির্দিষ্ট এলাকায় চলাচলকারী নৌকার সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে উৎপাদন অনুমান করেন। কিছু ক্ষেত্রে, কয়েকজন বড় পাইকারি ব্যবসায়ী যে সংখ্যা দেন, তাই পুরো জেলার হিসাব বলে ধরে নেওয়া হয়।
বরিশালের একজন মৎস্য কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ইলিশ উৎপাদনের তথ্য সংগ্রহের কোনো নির্দিষ্ট একক পদ্ধতি নেই। কখনো ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তথ্য নিই, কখনো বা নৌকা মালিকদের থেকে। আমরা প্রতিটি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে যেতে পারি না।’
মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশ ব্যবস্থাপনা বিভাগের উপ-পরিচালক ফিরোজ আহমেদ স্বীকার করেন যে, প্রক্রিয়াটি মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভরশীল। তিনি বলেন, ‘উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তারা তাদের তথ্য পাঠান। আমরা সেগুলোকে একত্র করে মোট পরিসংখ্যান তৈরি করি।’
সংগ্রহের ভেতরের প্রক্রিয়া
ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার আপু জানান, একটি সফটওয়্যারের মাধ্যমে ইলিশের তথ্য হালনাগাদ করা হয়। তিনি বলেন, ‘আমাদের তথ্য সংগ্রহকারীরা অবতরণ কেন্দ্রগুলো থেকে প্রতিদিনের তথ্য সংগ্রহ করেন। আমরা নিজেরাও কিছু যাচাই করি। তবে প্রতিটি স্থান কভার করা অসম্ভব।’
অন্যান্য স্থানে, প্রক্রিয়াটি আরও অনানুষ্ঠানিক। ভোলার বকশি ফিশ টার্মিনালের আমিনুল ইসলাম তুহিন হাওলাদার বলেন, ‘ইলিশের তথ্য সংগ্রহ করতে কেউ আসে না। মৎস্য কর্মকর্তারা মৌসুমের সময় দু-একবার আসেন, কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেন এবং একটি মোটামুটি অনুমান তৈরি করে চলে যান।’
চার দশক ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কক্সবাজারের ব্যবসায়ী ও ট্রলার মালিক বাশি সওদাগর জানান, স্থানীয় মৎস্য অফিস বছরে দু-একবার তাদের সঙ্গে সভা করে। তিনি বলেন, ‘তারা আমাদের আমন্ত্রণ জানায়, ৫০০ টাকা সম্মানী দেয়, হালকা খাবার পরিবেশন করে এবং কিছু মাছ ধরার তথ্য জানতে চায়।’
কর্মকর্তাদের পক্ষে সাফাই
তবে মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের দাবি, প্রক্রিয়াটি ত্রুটিপূর্ণ হলেও এটি যুক্তিসঙ্গতভাবে সঠিক হিসাব দেয়। চাঁদপুর সদরের সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মির্জা ওমর ফারুক বলেন, ‘আমরা প্রধান অবতরণ কেন্দ্র এবং কয়েকটি ছোট কেন্দ্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করি। আমরা বেশ কয়েকজন জেলে এবং ব্যবসায়ীর সঙ্গেও ক্রস-চেক করি।’
পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় সিনিয়র কর্মকর্তা অপু সাহা বলেন, তার দল নৌকার সংখ্যা এবং প্রতি নৌকার গড় ইলিশ আহরণের ওপর নজর রাখে। তিনি বলেন, ‘আমাদের কর্মীরা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে এবং মাঠ পর্যায়ের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে তা ক্রস-চেক করে। এরপর আমরা সেই হিসাব একত্রিত করি।’
কক্সবাজারের আরেক কর্মকর্তা সুজয় পাল বলেন, উপকূলীয় ও সামুদ্রিক মৎস্য প্রকল্পের তথ্য স্থানীয় পরিসংখ্যানকে পরিপূরক করে। তিনি বলেন, ‘আমরা বোটম্যান, ব্যবসায়ী এবং অবতরণ কেন্দ্রের ম্যানেজারদের সঙ্গে কথা বলে একটি বিস্তৃত চিত্র পাওয়ার চেষ্টা করি।’
তবুও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা স্বীকার করেন যে, নমুনা সংগ্রহ মাত্র পাঁচ শতাংশ অবতরণ কেন্দ্র বা প্রধান ব্যবসায়ীকে কভার করে। বাকিটা আগের বছরের পরিসংখ্যান এবং বর্তমান বাজারের প্রবণতার ওপর ভিত্তি করে অনুমান করা হয়। এতে ভুল হওয়ার সুযোগ থেকেই যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উৎপাদন ভুল পরিসংখ্যান ইলিশের দাম নির্ধারণের সঙ্গে মেলে না। শুধু দাম নয়, এ ধরনের পরিসংখ্যান মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা থেকে শুরু করে রপ্তানি কোটা পর্যন্ত সকল বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণকেই ত্রুটিপূর্ণ করে দেয়। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ইলিশ ধরার জেলে থেকে সাধারণ ভোক্তার ওপর। আর এ কারণেই সরবরাহ বৃদ্ধির দাবি সত্ত্বেও, ইলিশের দাম বাড়তেই থাকছে।


