শিগগিরই বহুল প্রতীক্ষিত চীন সফরে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত এপ্রিলের শুরুতে এই বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের কারণে সফরটি এক মাস পিছিয়ে দেওয়া হয়।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, আগামী বুধবার (১৪ মে) বেইজিং সফর করবেন ট্রাম্প। সফরে অন্যতম আকর্ষণ থাকবে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক। ট্রাম্পের সফরসূচি অনুযায়ী, বুধ ও বৃহস্পতিবার শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক হবে।
ট্রাম্পের এই সফর হবে অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি জাঁকজমকপূর্ণ। দুই নেতা গ্রেট হল অব দ্য পিপলে বৈঠকের পাশাপাশি ইউনেসকো ঘোষিত ঐতিহ্যবাহী স্থান টেম্পল অব হেভেন পরিদর্শন করবেন। শিয়ের আতিথেয়তায় রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় যোগ দেবেন ট্রাম্প এবং সেখানে একসঙ্গে চা পান ও মধ্যাহ্নভোজ করবেন।
ট্রাম্পের সফরসঙ্গী হিসেবে থাকবেন ইলন মাস্ক ও টিম কুকের মতো টেক জায়ান্টরা। তবে ২০১৭ সালে বেইজিং সফরের তুলনায় এবারের প্রতিনিধিদল ছোট।
ট্রাম্প সোমবার জানান, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির পাশাপাশি তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রি এবং কারাবন্দি গণমাধ্যম ব্যবসায়ী জিমি লাইয়ের বিষয়েও শি জিনপিংয়ের সঙ্গে আলোচনা করবেন।
ট্রাম্প বলেন, ‘আগের মার্কিন প্রেসিডেন্টদের শাসনামলে বছরের পর বছর ধরে আমরা চীনের কাছে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। এখন আমরা ভালো করছি। আমি তাকে (শি) অনেক সম্মান করি এবং আশা করি সেও আমাকে সম্মান করে।’
গত বছরের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা নিয়েই প্রধান অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী চীনকে চাপে ফেলার হুঁশিয়ারি দেন ট্রাম্প। সে অনুযায়ী, চীনের অধিকাংশ পণ্যে ২০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপও করেছিলেন তিনি।
অবশ্য ২০২৫ সালের অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ার বুসানে এপেক সম্মেলনের সাইডলাইনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে একান্ত বৈঠক শেষে বেইজিংয়ের ওপর আরোপিত শুল্ক কমানোর ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তার এই সিদ্ধান্তকে যুক্তরাষ্ট্র-চীন কূটনৈতিক দুরত্ব মেটানোর পথ হিসেবেও উল্লেখ করেন বিশ্লেষকরা।
ওই বৈঠকেই ট্রাম্পকে চীন সফরের আমন্ত্রণ জানান শি জিনপিং। ধারণা করা হচ্ছিল, এই সফর থেকে দুই দেশের বাণিজ্য যুদ্ধ বন্ধের পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য নতুন পথ উন্মোচিত হবে।
তবে ট্রাম্প এবার চীন সফরে যাচ্ছেন অনেকটাই ভিন্ন বাস্তবতায়। তার একক সিদ্ধান্তে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর আরোপিত শুল্কনীতি এরইমধ্যে আদালতের রায়ে মুখ থুবড়ে পড়েছে। ফলে অতিরিক্ত শুল্ক থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার উপার্জনের পথও বন্ধ হয়ে গেছে।
সেই সঙ্গে সয়াবিন, গরুর মাংস ও বোয়িং বিমানের মতো কয়েকটি বাণিজ্যিক চুক্তি এবং বিশ্বকে অস্থিতিশীল করে তোলা ইরান যুদ্ধ নিরসনে বেইজিংয়ের সহযোগিতা পাওয়ার সুযোগও শঙ্কায় পড়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বাস্তবতা ট্রাম্পের কৌশলগত অবস্থানকে দুর্বল করে দিয়েছে।
এমনকি শিয়ের সঙ্গে শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক থেকেও বড় ধরনের অর্থনৈতিক সাফল্যের সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সফর সংশ্লিষ্ট মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, কয়েকটি চুক্তি এবং ভবিষ্যৎ বাণিজ্য ব্যবস্থাপনার কিছু কাঠামোতে সম্ভাব্য সফলতা অর্জন সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। এমনকি বাণিজ্যযুদ্ধের সাময়িক বিরতি বাড়ানো হবে কি না, সেটিও অনিশ্চিত।
অন্যদিকে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে উপ-জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ম্যাট পটিঞ্জার গত সপ্তাহে তাইপের এক ফোরামে বলেন, ‘চীন হয়তো বৈঠক থেকে এমন ফলাফল চায় যা যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাকে দুর্বল করবে, তবে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের অর্থনৈতিক ক্ষতি থেকেও তারা মুক্ত নয়।’
পটিঞ্জারের মতে, এর বিনিময়ে বেইজিং কিছু প্রত্যাশা করবে। আর শি জিনপিংয়ের অগ্রাধিকার তালিকার শীর্ষে রয়েছে তাইওয়ান। স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলটিকে চীন নিজেদের অংশ বলে দাবি করে আসছে, যাদের স্বাধীনতার দাবিতে পূর্ণ সমর্থন দিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র।
হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও অধ্যাপক আলেহান্দ্রো রেয়েস বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের চীনকে প্রয়োজন, চীনের ট্রাম্পকে নয়।’
তিনি বলেন, ‘তার (ট্রাম্প) একটি পররাষ্ট্রনীতি-সংক্রান্ত সাফল্য দরকার। এমন একটি সাফল্য, যা দেখাবে তিনি বিশ্বে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে চান এবং তিনি শুধু বৈশ্বিক রাজনীতিকে অস্থির করে তুলছেন না।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্প এখন চাইছেন, চীন যেন ঘনিষ্ঠ মিত্র ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতায় আসতে রাজি করতে ভূমিকা রাখে। তেহরানের ওপর ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও এখনো বেইজিং ইরানি তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা।


