ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধবিরতি এখন ‘লাইফ সাপোর্টে’ আছে বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ শেষ করতে ওয়াশিংটন প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে তেহরান যা জবাব দিয়েছে তা যুদ্ধ শেষ করার পরিস্থিতি থেকে যোজন যোজন দূরে।’
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার বলেন, ‘বহু বহু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে দুই পক্ষ এখনো অনেক বিপরীতমুখী অবস্থানে রয়েছে, যার সমাধান ছাড়া শান্তি আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ নেই।’
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবের জবাবে ইরান সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধের দাবি জানিয়েছে। এর মধ্যে লেবাননে চলমান ইসরায়েলি হামলা বন্ধসহ ইরান সমর্থিত সশস্ত্রগোষ্ঠী হিজবুল্লাহের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি বাহিনীর ক্রমাগত সংঘর্ষ বন্ধেরও শর্ত যোগ করা হয়েছে।
পাশাপাশি তেহরান যুদ্ধের ফলে ক্ষতিপূরণ, ইরানের বন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, ভবিষ্যতে আর কোনো হামলা না করার নিশ্চয়তা এবং ইরানের তেল বিক্রি পুনরায় চালুর দাবিও জানিয়েছে।
এ ছাড়া ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি জোর দিয়ে তুলে ধরেছে। বর্তমানে ইরানের সেনাবাহিনী প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে।
ইরানের শর্তের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানের শর্ত যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎকেই হুমকির মুখে ফেলেছে। ওরা যে আবর্জনা আমাদের পাঠিয়েছে, সেটা পড়ার পর আমি বলব যুদ্ধবিরতি এখন লাইফ সাপোর্টে আছে। এটি খুবই নাজুক অবস্থা। আমি ওদের পুরো লেখাটাও পড়ে শেষ করিনি।’
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হরমুজ প্রণালির আশপাশে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরির পর ইরানের কাছে নতুন শান্তি চুক্তির প্রস্তাব পাঠায় যুক্তরাষ্ট্র। এতে বলা হয়, প্রথমে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ বন্ধ করা হবে, এরপর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো বিতর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু হবে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের পাল্টা প্রস্তাব পাঠিয়ে সেই অবস্থানকে ‘বৈধ’ দাবি করেছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই। তিনি বলেন, ‘আমাদের দাবি সম্পূর্ণ ন্যায্য।’
ট্রাম্পের হুঁশিয়ারির জবাবে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, ‘যে কোনো “আগ্রাসনের” জবাব দিতে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে।’
এদিকে ইরান সমর্থিত কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর সোমবার নতুন করে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের দাবি, কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ইরানের তেল চীনে পাচারে সহায়তা করছে। এই নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে তেহরানের সামরিক ও পারমাণবিক কর্মসূচির অর্থায়ন বন্ধ করাই ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে বিভিন্ন ব্যাংককে বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টার বিষয়েও সতর্ক করেছে ট্রাম্প প্রশাসন।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান টানাপড়েনে হরমুজ প্রণালিতে সৃষ্ট অচলাবস্থায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও ফের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম তিন শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৪ ডলার ছাড়িয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে, অর্থাৎ ২৮ ফেব্রুয়ারির আগে, বিশ্বের মোট তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেলের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। যুদ্ধের পর থেকে তাই এই প্রণালিই একে অপরকে কুপোকাত করার পথ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শুধু তাই নয়, হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থায় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোও রপ্তানি কমাতে বাধ্য হয়েছে। রয়টার্সের এক জরিপ অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে ওপেকভুক্ত দেশগুলোর তেল উৎপাদন কমে দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও যুদ্ধ নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব বাড়ছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনের ছয় মাসেরও কম সময় বাকি থাকায় পরিস্থিতি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে কি না, সেটি নির্ধারিত হবে।
সোমবার প্রকাশিত রয়টার্স ও ইপসোসের এক জরিপে দেখা গেছে, প্রতি তিনজন আমেরিকানের মধ্যে দুজন মনে করেন, কেন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়েছে—তা ট্রাম্প স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেননি।
জরিপে অংশ নেওয়া ৬৬ শতাংশ মানুষ বলেছেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পৃক্ততার উদ্দেশ্যও ট্রাম্প পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করেননি। এর মধ্যে রিপাবলিকানদের এক-তৃতীয়াংশ এবং প্রায় সব ডেমোক্র্যাটও একই মত দিয়েছেন।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার গালিবাফও যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের বিষয়টি তুলে ধরে ট্রাম্পকে সতর্ক করেছেন। তার মতে, যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হলে এর অর্থনৈতিক চাপ আমেরিকান জনগণের ওপর তীব্র থেকে তীব্রতর হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘তারা যত বেশি সময়ক্ষেপণ করবে, মার্কিন করদাতাদের তত বেশি মূল্য দিতে হবে।’
আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়েও ওয়াশিংটন সমস্যায় পড়েছে। পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি ও আন্তর্জাতিক ম্যান্ডেট ছাড়া ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করতে যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভেতরেও এই যুদ্ধ নতুন বিভাজন তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু মিত্র এখন সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের পাল্টা হামলার সবচেয়ে বেশি তোপের মুখে পড়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত।


