ইরানের মেয়ে শিশুদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলায় ১৭০ জনকে হত্যার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের জড়িত থাকার দাবি করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। ইরান যুদ্ধের শুরুতেই ওই স্কুলে চালানো হামলার স্বাধীন তদন্ত করে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। তাদের দাবি, এই হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।
সংস্থাটি সোমবার জানায়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের শহর মিনাব-এ ওই বিদ্যালয়ে হামলায় সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি একটি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল। তাদের মতে, এই ক্ষেপণাস্ত্র অত্যন্ত নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে সক্ষম এবং এই সংঘাতে এটি মূলত মার্কিন বাহিনীই ব্যবহার করে থাকে।
স্যাটেলাইট ছবি, ভিডিও ফুটেজ এবং বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎকার বিশ্লেষণ করে অ্যামনেস্টি জানায়, হামলায় বিদ্যালয়ের ভবনটি সরাসরি আঘাতপ্রাপ্ত হয়। এ ছাড়াও পাশেই থাকা ইসলামিক রেভ্য্যুলশনারি গার্ড করপসের (আইআরজিসি) একটি কম্পাউন্ডের ভেতরে থাকা আরও প্রায় ডজনখানেক স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সংস্থাটির মতে, স্যাটেলাইট ছবিতে শিশুদের স্কুলটির অবস্থান স্পষ্টভাবেই কম্পাউন্ডের বাইরে দেখা যায়। এতেই প্রমাণিত- হামলার সময় বেসামরিক নাগরিকদের ক্ষতি এড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সতর্কতা নেওয়া হয়নি। আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের দৃষ্টিতে এটি একটি গুরুতর লঙ্ঘন।
অ্যামনেস্টি আরও বলেছে, বিদ্যালয় ভবনটি সরাসরি লক্ষ্যবস্তু হওয়া এবং আগে এটি আইআরজিসি কম্পাউন্ডের অংশ ছিল—এই তথ্য থেকে ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো পুরোনো বা ভুল গোয়েন্দা তথ্যের ওপর নির্ভর করেছিল। একই সঙ্গে লক্ষ্যবস্তুটি সামরিক স্থাপনা কি না, তা যাচাই করার দায়িত্বও যথাযথভাবে পালন করা হয়নি।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাদের বিবৃতিতে বলেছে, মিনাবের হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
সংস্থাটির গবেষণা, নীতি ও প্রচার বিভাগের সিনিয়র পরিচালক এরিকা গুয়েভারা-রোসাস বলেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র হামলার আগে ভবনটিকে একটি বিদ্যালয় হিসেবে শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়ে থাকে এবং তবুও হামলা চালিয়ে থাকে, তাহলে তা হামলার পরিকল্পনায় গুরুতর অবহেলার প্রমাণ।
তার মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক গোয়েন্দা ব্যবস্থার বড় ধরনের ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয় এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন হতে পারে।
অন্যদিকে, যদি যুক্তরাষ্ট্র জানত যে বিদ্যালয়টি আইআরজিসি কম্পাউন্ডের পাশে অবস্থিত, তবুও বেসামরিক প্রাণহানি কমাতে প্রয়োজনীয় সতর্কতা না নিয়ে হামলা চালানো হয়ে থাকে, তাহলে সেটি বেসামরিক মানুষের ওপর নির্বিচারে হামলা হিসেবে বিবেচিত হবে।
সে ক্ষেত্রে ঘটনাটি যুদ্ধাপরাধ হিসেবে তদন্ত করা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মানবাধিকার কর্মীরা মনে করছেন, মিনাবের এই হামলা ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধের একটি উদাহরণ হতে পারে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, গত মাসের শেষ দিকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী হতে পারে।
ওয়াশিংটন ঘটনাটির তদন্তের প্রতিশ্রুতি দিলেও এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ ও দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে।
এদিকে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা এই হামলাকে ‘শিশুদের ওপর ভয়াবহ আঘাত’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটিক পার্টির কয়েকজন আইনপ্রণেতাও ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে জানতে চেয়েছেন—কীভাবে এবং কেন এমন একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটল।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইন মানা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ মন্তব্য করেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র ‘বোকামি ধরনের নিয়ম-কানুন’ মেনে চলবে না।
গত ২ মার্চ সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘কথিত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান যা-ই বলুক না কেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী এবং নির্ভুল বিমান হামলা চালাচ্ছে। আমরা জয়ের জন্য লড়াই করি, সময় বা প্রাণ অকারণে নষ্ট করি না।’


