মাত্র এক মাসের ব্যবধানে আবারও ভারী বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় নাকাল হয়ে পড়েছে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। রোববার রাত থেকে শুরু হওয়া টানা বর্ষণে সোমবার সকালেই নগরীর বিভিন্ন সড়ক ও অলিগলি গোড়ালি থেকে হাঁটু, কোথাও কোথাও কোমরসমান পানিতে তলিয়ে যায়। সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে এমন পরিস্থিতিতে অফিস-আদালত ও স্কুল-কলেজগামী মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।
সড়কে পানির তীব্র স্রোত, জলজট ও গণপরিবহনের ধীরগতির কারণে নগরজুড়ে দেখা দেয় ভোগান্তি। অনেক এলাকায় যানবাহন চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। পানির কারণে পথচারী ও শিক্ষার্থীদের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে দেখা গেছে।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তা মো. ইসমাইল ভূঁইয়ার তথ্য অনুযায়ী, রোববার সকাল ৯টা থেকে সোমবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ১৮৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে সোমবার সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টায় অতি ভারী বর্ষণ হয়েছে। এ সময় ১০৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ এবং মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকার প্রভাবে এ বৃষ্টি হচ্ছে।
আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, লঘুচাপের প্রভাব ও মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় চট্টগ্রামে আরও দুই থেকে তিন দিন ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে নগরীর জলাবদ্ধ পরিস্থিতি আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভারী বর্ষণে চকবাজার, কাতালগঞ্জ, পাঁচলাইশ, মুরাদপুর, ফরিদারপাড়া, আগ্রাবাদ, উত্তর কাট্টলী, দক্ষিণ নালাপাড়া, জামালখান, রাহাত্তারপুল, বাকলিয়া, নিউমার্কেট, রিয়াজুদ্দিন বাজার ও কাপাসগোলাসহ নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়।
অল্প সময়ের মধ্যেই বিভিন্ন সড়কে হাঁটুসমান পানি জমে যায়। কোথাও কোথাও পানির উচ্চতা কোমর পর্যন্ত পৌঁছে। জলাবদ্ধতার কারণে প্রধান সড়কগুলোতে যানবাহন ধীরগতিতে চলাচল করে। অনেক ছোট যানবাহন পানিতে বিকল হয়ে পড়ে।
নগরীর আখতারুজ্জামান চৌধুরী ফ্লাইওভারেও জলজট দেখা দেয়। ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে গাড়ি চলাচলের সময় ওপর থেকে পানি পড়তে দেখা যায়। এতে যানবাহনের গতি কমে গিয়ে সেখানে তৈরি হয় দীর্ঘ যানজট।

কাতালগঞ্জ ও পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকার বাসিন্দাদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, হিজড়া খালের সংস্কার ও সম্প্রসারণের কাজ পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে ভারী বৃষ্টি হলেই এসব এলাকায় দ্রুত পানি জমে, দীর্ঘ সময়েও তা নামছে না।
দক্ষিণ নালাপাড়ার জলমগ্ন সড়ক পেরিয়ে অফিসে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী শিপ্রা দত্ত বলেন, ‘তীব্র পানির স্রোতের কারণে হেঁটে চলাচল করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। রিকশা ছাড়া যাতায়াতের উপায় নেই। স্বাভাবিক সময়ে বাসা থেকে নিউমার্কেট মোড়ে যেতে ৩০ থেকে ৪০ টাকা ভাড়া লাগে। কিন্তু জলাবদ্ধতার কারণে একই পথ যেতে তাকে ১৫০ টাকা দিতে হয়েছে। এমনকি মাত্র ১০০ ফুট পানিবন্দী রাস্তা পার করতেও অতিরিক্ত ১০০ টাকা ভাড়া দাবি করা হচ্ছে।
চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনে ১৪ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা ব্যয়ে চারটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক), চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ও পানি উন্নয়ন বোর্ড। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রকল্পগুলোর সিংহভাগ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।
তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও ভারী বৃষ্টিতে নগরীর পুরোনো চিত্র ফিরে আসায় প্রশ্ন উঠেছে এসব প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও কেন নগরবাসীকে একই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে—এ প্রশ্ন এখন আবারও সামনে এসেছে।
নগরবাসীর অভিযোগ, শুধু খাল খনন বা নালা সংস্কার করলেই জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান হবে না। পানি প্রবাহের পথ সচল রাখা, খাল-নালা দখলমুক্ত করা, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং প্রকল্পগুলোর মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘সকালে ভারী বৃষ্টির সঙ্গে জোয়ারের পানির তীব্র চাপ থাকায় কিছু কিছু এলাকায় পানি জমেছে। চসিকের কর্মীরা নালা-নর্দমা পরিষ্কার ও পানি নিষ্কাশনের কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। বৃষ্টি কমে গেলে দ্রুত পানি নেমে যাবে।’


