বরিশাল লঞ্চঘাট থেকে বাঁধ রোড হয়ে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের দিকে এগোলেই চোখে পড়বে একটি দ্বিতল ভবন। এক পাশে বিআইডব্লিউটিএ-এর অফিস, অন্য পাশে ডায়াবেটিক হাসপাতাল; আর মাঝের ৫৪ শতাংশ মাঠ জুড়ে শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের নীরব সাক্ষী—‘বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরি’।
ঊনিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে এই জনপদের শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে আলো ছড়িয়ে আসছে এই প্রতিষ্ঠান। সুরম্য ভবনের ভেতরে সারি সারি বইয়ের আলমারি আর বড় দুটি হলরুম জানান দেয়, এখানে একসময় একসঙ্গে অন্তত ১০০ জন পাঠক বুঁদ হয়ে থাকতেন বইয়ের পাতায়। তবে আজ সেই চঞ্চলতা কিছুটা মলিন। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক কিংবা মহাত্মা অশ্বিনীকুমার দত্তের মতো মহানায়কদের স্মৃতিধন্য এই লাইব্রেরি আজ দাঁড়িয়ে আছে এক গৌরবময় ইতিহাস আর বর্তমানের কিছু নির্মম বাস্তবতার সন্ধিক্ষণে।
বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরির শেকড় খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে গণগ্রন্থাগার আন্দোলনের শুরুর দিনগুলোতে।
একসময় গ্রন্থাগার ছিল কেবল সমাজের অভিজাত ও রাজন্যবর্গের একচেটিয়া অধিকার। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে জ্ঞানকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে জন্ম নেয় গণগ্রন্থাগার, যা পরিচিতি পায় ‘জনতার বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে।
পাশ্চাত্য বিশ্বে যখন এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছিল, তার ছোঁয়া এসে লাগে তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশেও। এরই ধারাবাহিকতায় ১৮৩৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘কলকাতা পাবলিক লাইব্রেরি’। তবে প্রকৃত বিপ্লবটি ঘটে ১৮৫০ সালের ১৪ আগস্ট, যখন ইংল্যান্ডে পাস হয় ঐতিহাসিক ‘পাবলিক লাইব্রেরি অ্যাক্ট’। এই আইনের হাত ধরেই উপমহাদেশে শুরু হয় ‘পাবলিক লাইব্রেরি মুভমেন্ট’ বা গণগ্রন্থাগার আন্দোলন। যার ঢেউ তৎকালীন পূর্ববঙ্গেও এসে আছড়ে পড়ে। ১৮৫৪ সালে পূর্ববঙ্গের বগুড়া, যশোর, রংপুর এবং বরিশালে গণগ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা ছিল সেই সময়ের এক যুগান্তকারী ঘটনা। আর পূর্ববঙ্গ, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও উড়িষ্যা—এই চার প্রদেশের সীমানায় সবচেয়ে পুরনো পাঠাগার হিসেবে অক্ষয় কীর্তি হয়ে টিকে আছে এই বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরি।
১৮৫৪ সালের সেই শুরুর দিনগুলোতে লাইব্রেরিটির ঠিকানা কিন্তু বাঁধ রোডে ছিল না। তখন এটি প্রতিষ্ঠিত হয় নগরীর বিবির পুকুর পাড়ের এনএক্স ভবন সংলগ্ন ব্রিটিশ আমলের একটি পুরনো ভবনে। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে, ১৯৮৫ সালে লাইব্রেরিটি স্থানান্তরিত হয় বাঁধ রোডের নিজস্ব জমিতে।
এই দীর্ঘ পথচলায় লাইব্রেরিটি শুধু বই-ই জমায়নি, জমিয়েছে ইতিহাসের বহু দুর্লভ রত্ন। এখানকার আলমারিগুলোতে ইতিহাস, বিজ্ঞান, ধর্ম, দর্শন, আইন, অর্থনীতি ও সাহিত্যসহ বিভিন্ন বিষয়ের প্রায় ৩০ হাজার মূল্যবান বই রয়েছে। যার ৬০ শতাংশ উপন্যাস, ৩০ শতাংশ রেফারেন্স বুক এবং ১০ শতাংশ গবেষণাগ্রন্থ। বাংলা ভাষার বইয়ের প্রাধান্য থাকলেও এখানে সগৌরবে টিকে আছে ইংরেজি, উর্দু, আরবি ও হিন্দি ভাষার দুষ্প্রাপ্য বহু গ্রন্থ।
লাইব্রেরির ক্যাটালগ সূত্র ও ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, একসময় এখানে সংরক্ষিত ছিল তুলট কাগজ ও তালপাতায় সংস্কৃত ভাষায় লেখা হাতে বোনা পাণ্ডুলিপি। মহাকবি কালিদাসের হাতে লেখা পুঁথি, প্রাচীন রামায়ণ, মহাভারত এবং নলখাগড়ার কলম ও ভূষা কালিতে লেখা দুর্গাপূজা পদ্ধতির বর্ণনার মতো অমূল্য সব সম্পদ ছিল এই লাইব্রেরির অহংকার। এছাড়া শ্রীরঘুরাম কবিরাজ, শ্রী কাশিরাম দাশ, ত্রিলোচন দাস কিংবা মুকুন্দরাম দাশের মতো প্রাচীন লেখকদের মূল রচনা গবেষকদের টেনে আনত এই চত্বরে।
কে নেই এই লাইব্রেরির পাঠক বা সদস্যের তালিকায়? স্মৃতির পাতা ওল্টালে দেখা যাবে, পাকিস্তানি আমলের সাবেক মন্ত্রী আযীজ উদ্দীন আহম্মদ, খান বাহাদুর হাশেম আলী খান, বিচারপতি মুহাম্মদ ইব্রাহিম, আবদুল ওহাব খান, প্রখ্যাত নাট্যশিল্পী এ.টি.এম. ফারুক এবং প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ সরদার ফজলুল করিমের মতো ব্যক্তিত্বরা নিয়মিত পা রাখতেন এখানে। কিংবদন্তি সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী, কবি আসাদ চৌধুরী, কবি আহসান হাবীব, ভাষাসৈনিক মহিউদ্দিন আহমেদ এবং খ্যাতিমান লেখক শামসুদ্দিন আবুল কালাম ও সাংবাদিক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার মতো গুণীজনদের নিয়মিত আড্ডায় মুখর থাকত এই প্রাঙ্গণ।
প্রায় দুই হাজার আজীবন ও সাময়িক সদস্যের এই লাইব্রেরিতে একসময় প্রতিদিন দুই শতাধিক পাঠকের সমাগম হতো। দু’জন লাইব্রেরিয়ানসহ ৫ জন কর্মচারী সামলাতেন এর ব্যস্ততা। মাত্র ২০০ টাকা ভর্তি ফি আর মাসিক ২০ টাকা চাঁদায় আজীবন সদস্য হওয়ার সুযোগ থাকলেও, ২০০৪ সাল থেকে লাইব্রেরিটিতে এক ধরনের থমথমে অচলাবস্থা চলছে। শহরে নতুন বিভাগীয় গণগ্রন্থাগার গড়ে ওঠা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা মূল লোকালয় থেকে এর কিছুটা দূরত্ব এবং নতুন বই ক্রয়ের অভাব—সব মিলিয়ে পাঠক সংখ্যা এখন তলানিতে।
বর্তমানে কোনো লাইব্রেরিয়ান নেই, ভবনের কিছু অংশ অযত্ন আর অবহেলায় জরাজীর্ণ। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হওয়ার পথে অনেক দুর্লভ বই।
বর্তমানে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে একটি কমিটির মাধ্যমে এটি পরিচালিত হচ্ছে, যার সভাপতি পদাধিকারবলে স্বয়ং জেলা প্রশাসক। কমিটির সদস্য কাজী এনায়েত হোসেন শিবলু, মহিউদ্দিন মানিক বীরপ্রতীক এবং আজীবন সদস্য অধ্যাপক নজরুল হক নীলুসহ সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা চেষ্টা করছেন এর জৌলুস ধরে রাখতে। আর জেলা প্রশাসনের দেওয়া সামান্য সম্মানীতে এর দেখভালের দায়িত্বে আছেন শহীদুল ইসলাম নামের একজন কেয়ারটেকার।
তবে শত সংকটের মাঝেও পেছনের আঙিনায় জাগছে নতুন আশার আলো। লাইব্রেরির পেছনের অংশে জেলা প্রশাসন ‘কালেক্টরেট স্কুল’-এর একটি বহুতল ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্থানীয় সংস্কৃতিপ্রেমীদের প্রত্যাশা, স্কুলটি চালু হলে এই চত্বরে শিক্ষার্থীদের আনাগোনা বাড়বে, মুখরিত হবে লাইব্রেরি প্রাঙ্গণ।
সেই সাথে ঐতিহ্যবাহী এই লাইব্রেরিকে যদি যুগের চাহিদাপূর্ণ একটি আধুনিক ‘ডিজিটাল লাইব্রেরি’তে রূপান্তর করা যায়, তবে বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরি আবারও তার হারিয়ে যাওয়া প্রাণশক্তি ফিরে পাবে। নতুন প্রজন্মের বুকে জ্বালিয়ে দেবে জ্ঞানের অবিনাশী আলো।


