সম্প্রতি পাস হওয়া ব্যাংক রেজুলেশন আইন নিয়ে দেশের আর্থিক খাতে ব্যাপক বিতর্ক ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই আইনের কারণে বিতর্কিত এস আলম গ্রুপ ও নাসা গ্রুপের মতো সাবেক মালিকরা সংকটে পড়া ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে পারেন। এই দুই গ্রুপের বিরুদ্ধে ব্যাংক জালিয়াতি, অর্থ পাচার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
গত শুক্রবার সংসদে এই বিলটি পাস হওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যেও অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। অনেকে মনে করছেন এই আইনটি আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর ফেরার পথ করে দেবে।
বিতর্কের মূলে রয়েছে আইনের নতুন যুক্ত হওয়া ১৮-এ ধারা। অর্থনীতিবিদ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে এই ধারাটি একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের সাবেক শেয়ারহোল্ডারদের জন্য দরজা খুলে দিতে পারে। নতুন এই ধারা অনুযায়ী রেজুলেশন প্রক্রিয়ার আগের শেয়ারহোল্ডার অথবা বাংলাদেশ ব্যাংকের দৃষ্টিতে উপযুক্ত ব্যক্তিরা পুনরায় শেয়ার কেনা বা সম্পদের মালিকানা নেওয়ার আবেদন করতে পারবেন।
এই বিধানের আর্থিক শর্তগুলো নিয়েও সমালোচকরা প্রশ্ন তুলেছেন। একীভূত ব্যাংকগুলোকে স্থিতিশীল করতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিপুল পরিমাণ অর্থ জোগান দিয়েছে। কিন্তু মালিকানা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে এই অর্থ সম্পূর্ণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি। আবেদনকারীকে মোট অর্থের মাত্র সাড়ে সাত শতাংশ পে-অর্ডারের মাধ্যমে জমা দিতে হবে। বাকি ৯২ দশমিক ৫ শতাংশ অর্থ দুই শতাংশ সরল সুদে দুই বছরের মধ্যে পরিশোধ করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে জানান, অত্যন্ত কম প্রাথমিক খরচে সাবেক মালিকরা ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে পারেন। তার মতে, একবার মালিকানা ফিরে পেলে তা পুনরায় বাতিল করা কঠিন হয়ে পড়বে।
একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের মধ্যে চারটি ছিল এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে এবং একটি ছিল নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের অধীনে। অনেক বিশ্লেষক তাই এই নতুন ধারাটিকে সাধারণ কোনো আইনি প্রক্রিয়া না বলে প্রভাবশালীদের ফেরার কৌশল হিসেবে দেখছেন।
আইনটির খসড়া তৈরির প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ডজনেরও বেশি কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা গেছে, এই প্রক্রিয়াটি মূলত অর্থ মন্ত্রণালয় এবং আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ নিয়ন্ত্রণ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক ভূমিকা থাকলেও বিতর্কিত এই নতুন ধারাটি নিয়ে তারা চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ পাননি।
একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, মূল খসড়ায় এই ধারাটি ছিল না। এটি পরে যুক্ত করা হয়েছে। বিলটি পর্যালোচনার জন্য গত ১ এপ্রিল অতিরিক্ত সচিব মো. আজিমুদ্দিন বিশ্বাসের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের চারজন এবং আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ বিভাগের দুইজন সদস্য থাকলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি ছিলেন মাত্র তিনজন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিনিধিরা তাদের মতামত দেওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ পাননি বলে অভিযোগ উঠেছে।
এমন এক সময়ে এই আইনি পরিবর্তন এল যখন নতুন গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর এই একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার গতি কমে যায়। গত ১৬ মার্চ ব্যাংকটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া পদত্যাগ করেন। সরকার নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দিলেও তিনি দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করেছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ব্যাংকটির কার্যক্রম এখন কার্যত বন্ধ রয়েছে।
একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর আর্থিক সংকটের চিত্র অত্যন্ত ভয়াবহ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে এই পাঁচটি ব্যাংকের মোট ঋণের ৮৪ দশমিক ২৩ শতাংশই খেলাপি। তাদের মোট মূলধন ঘাটতির পরিমাণ এক লাখ ৫০ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা। এই বিশাল ঘাটতি মেটাতে ৩৫ হাজার কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন নিয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছিল। এর মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা এবং আমানতকারীদের শেয়ার থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা আসার কথা ছিল। এছাড়া ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স ট্রাস্ট ফান্ড থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৩৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়। ইতিমধ্যে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে গিয়ে আমানত বিমা তহবিলের ৮ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়ে গেছে।
সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের সাবেক পরিচালক জাবেদুল আলম চৌধুরী জানান, ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ জোরপূর্বক তাদের ব্যাংক দখল করে। তিনি অভিযোগ করেন, একটি রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে ব্যবহার করে অস্ত্রের মুখে তাদের কাছ থেকে ব্যাংকটি কেড়ে নেওয়া হয়। এরপর ব্যাপক লুটপাটের মাধ্যমে ব্যাংকটি ধ্বংস করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংকটি তাদের ফেরত না দিয়ে একীভূত করে দিয়েছিল। এখন নতুন আইনের ফলে সাবেক পরিচালকরা ফেরার সুযোগ পাচ্ছেন। এতে তারা একদিকে আশ্বস্ত হলেও অন্যদিকে উদ্বিগ্ন বোধ করছেন। নথিপত্র অনুযায়ী সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ১৮ শতাংশ শেয়ার এস আলম গ্রুপের হাতে রয়েছে। এই গ্রুপটি বিভিন্ন নামে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, এই নতুন ধারাটি মূলত সাবেক মালিকদের ফেরার একটি রাস্তা তৈরি করে দিয়েছে। তার মতে, এই উদ্যোগ সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের টিকে থাকাকেই ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, সাবেক মালিকরা মাত্র অল্প টাকা জমা দিয়ে মালিকানা ফিরে পাবেন এবং বাকি টাকা ব্যাংকিং খাতের ভেতর থেকেই সংগ্রহ করবেন। এতে পুরো রেজুলেশন প্রক্রিয়াই অর্থহীন হয়ে পড়বে। ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে কারা এই আইনের সুযোগ নেয় এবং তারা ব্যাংকগুলোকে আলাদা করতে চায় কি না তার ওপর।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী এসব উদ্বেগ প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, রেজুলেশনের বিকল্প পথ বাড়াতে এই পরিবর্তন আনা হয়েছে। তার মতে, আগে শুধু অবসায়ন বা তৃতীয় পক্ষের কাছে হস্তান্তরের সুযোগ ছিল। এখন ১৮-এ ধারার ফলে অভিযোগমুক্ত সাবেক বিনিয়োগকারী বা নতুন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সরকারের আর্থিক বোঝা কমানো এবং বিনিয়োগ করা অর্থ ফেরত পাওয়ার লক্ষ্যেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এস আলম বা নাসা গ্রুপের ফেরার বিষয়ে তিনি বলেন, সরকার আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে বদ্ধপরিকর। শুধু যেসব সাবেক পরিচালকের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই তারাই ফেরার সুযোগ পাবেন।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এ প্রসঙ্গে জানান, সরকার নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে। এটি সরকারের এখতিয়ারভুক্ত বিষয় নয় জানিয়ে তিতুমীর বলেন, ব্যাংক রেজুলেশন আইন সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরই জবাব দিতে পারবেন।


