ইতালি নিয়ে যাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে শ্রীলঙ্কা ও মিশরে আটকে রেখে অমানবিক নির্যাতন এবং অনৈতিক কাজে বাধ্য করার অভিযোগে আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের অন্যতম হোতা মোহাম্মদ আরজু রহমানকে (৪৭) গ্রেপ্তার করেছে এসআরবি। আরজু গত ১২ বছরে দুই হাজারের বেশি বাংলাদেশিকে বিদেশে পাচার করেছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
মঙ্গলবার রাজধানীর কারওয়ান বাজার এসআরবি মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-৪ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান। তিনি জানান, সোমবার বিকালে রাজধানীর বনানীর সি ব্লক এলাকা থেকে আরজু রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে হাফিজুর রহমান বলেন, মানবপাচার চক্রের প্রতারণার শিকার এক ভুক্তভোগী কামরুন্নাহার ফাতেমা গত ১৬ জুলাই মিশর থেকে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই)-এর সাথে যোগাযোগ করতে সক্ষম হন। ফাতেমা জানান, একটি মানবপাচার চক্র ইতালি নিয়ে যাওয়ার কথা বলে তাকে মিশরে আটকে রেখেছে।
এমন তথ্যের ভিত্তিতে এনএসআই গোয়েন্দা কার্যক্রম শুরু করে। আরজু দীর্ঘদিন মিশরে অবস্থান করছিলেন এবং তাকে সার্বক্ষণিক ট্র্যাকিং করা হচ্ছিল। কয়েকদিন আগে তিনি বাংলাদেশে আসেন এবং আগামী বৃহস্পতিবার পুনরায় মিশরে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। এনএসআই-এর প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
লে. কর্নেল হাফিজুর রহমান জানান, ফাতেমা ও তার পরিবারের মোট ৫ জন সদস্যকে ইতালি নিয়ে যাওয়ার কথা বলে আরজু তাদের কাছ থেকে ৮৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। এরপর ‘বাংলাদেশ থেকে ভিসা হবে না’ বলে তাদেরকে শ্রীলঙ্কায় নিয়ে গিয়ে সেখানে তাদের ওপর অমানবিক অত্যাচার চালান। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে পরিবারের ৩ জন পুরুষ সদস্য সেখান থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে ফেরত আসেন। তবে পরিবারটির দুই নারী সদস্য কামরুন্নাহার ফাতেমা ও আঞ্জুমান আরা আটকা পড়েন।
এর মধ্যে আঞ্জুমান আরা শ্রীলঙ্কা থেকে পালিয়ে এখনও দেশটির একটি স্থানে অবস্থান করছেন। আর ফাতেমাকে শ্রীলঙ্কা থেকে ‘ভিসা হবে না’ বলে মিশরে নিয়ে যাওয়া হয়। মিশরে নিয়ে যাওয়ার পর তার ওপর অমানবিক নির্যাতন চালিয়ে অনৈতিক কাজে বাধ্য করা হয়। অনৈতিক কাজে রাজি না হলে শরীরের বিভিন্ন অংশে সিগারেটের ছ্যাঁকাসহ নানা ধরনের নির্যাতন করা হতো।
এসআরবি কর্মকর্তা বলেন, এই চক্রটির মূলহোতা আরজুকে গ্রেপ্তারের পর জানা যায় সে গত ১২ বছর ধরে এই অপকর্মের সাথে জড়িত। এসময় সে দুই হাজারের বেশি বাংলাদেশিকে এই ধরনের প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশে নিয়ে গেছে। তাকে গ্রেপ্তারের খবর পেয়ে গত দুদিনে ৩০ থেকে ৩৫ জন ভুক্তভোগী এসআরবির সাথে যোগাযোগ করেছেন। দেশের বিভিন্ন থানায় আরজুর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।
আরজুর নিজস্ব কোনো ট্রাভেল এজেন্সির লাইসেন্স নেই উল্লেখ করে লে. কর্নেল হাফিজ বলেন, সে ‘আরজু ইমিগ্রেশন লিমিটেড’ ও ‘নাফিস এয়ার ইমিগ্রেশন লিমিটেড’—এর মতো ভুয়া নাম ব্যবহার করে গ্রামের সহজ-সরল মানুষদের বোকা বানিয়ে ইউরোপ পাঠানোর কথা বলে বিভিন্ন দেশে নিয়ে বিক্রি করে দিত এবং অনৈতিক কাজে বাধ্য করত। তার মোবাইলে পাওয়া একটি ব্যাংক স্টেটমেন্টে দেখা যায়, গত এক বছরে তার ১ কোটি ৭০ লাখ টাকার বেশি লেনদেন হয়েছে।
ভুক্তভোগী কামরুন্নাহার ফাতেমা এবং আঞ্জুমান আরাকে শ্রীলঙ্কা ও মিশর থেকে দেশে ফেরত আনার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে বলে জানান লে. কর্নেল হাফিজ।


