লালমনিরহাটে মেয়াদোত্তীর্ণ ও অপর্যাপ্ত ইঞ্জিনে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে রেল যোগাযোগ। মুখ থুবড়ে পড়েছে এই অঞ্চলের ট্রেনে যাত্রীসেবা। মাঝপথে ট্রেন বিকল হওয়া এবং চরম শিডিউল বিপর্যয় এখন এই অঞ্চলের নিত্যদিনের চিত্র। এতে সাধারণ যাত্রীদের পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ।
রেলওয়ে’র তথ্যে জানা যায়, লালমনিরহাট বিভাগে প্রতিদিন ২০ জোড়া ট্রেন চলাচলের জন্য অন্তত ৩০টি ইঞ্জিন বা লোকোমোটিভ প্রয়োজন। তবে বর্তমানে এই বিভাগে সচল ইঞ্জিনের সংখ্যা মাত্র ২১টি। উদ্বেগের বিষয় হলো এই ২১টি ইঞ্জিনের মধ্যে ১৬টিরই আয়ু শেষ হয়ে গেছে। বর্তমানে এসব মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন দিয়েই ১০ জোড়া আন্তঃনগরসহ মোট ২০ জোড়া ট্রেন কোনোমতে চালানো হচ্ছে।
ইঞ্জিন ও জনবল সংকটের কারণে ৪টি ডেমু, ৭টি মেইল এবং ১৪টি লোকাল ট্রেন বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।
মেয়াদ শেষ হওয়া এসব ইঞ্জিন দিয়ে ট্রেন চলাচল অব্যাহত রাখায় প্রায়ই মাঝপথে ট্রেন বন্ধ হয়ে যায়। এতে ট্রেনের গতি কমে যাওয়ার পাশাপাশি শিডিউল বিপর্যয় ঘটছে। লোকোমাস্টার বা ট্রেনেরচালকরা জানান, পুরনো ইঞ্জিনের কারণে ট্রেনের গতি অনেক কমে আসে। এতে যাত্রীদের দীর্ঘ সময় স্টেশনে অপেক্ষা করতে হয়, গন্তব্যে পৌঁছাতেও অনেক দেরি হয়।
লালমনিরহাট স্টেশনে বুড়িমারী যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা যাত্রী জমশের প্রামাণিক বলেন, ট্রেনের বগিগুলো অত্যন্ত জরাজীর্ণ এবং ইঞ্জিনের ওপর কোনো ভরসা করা যায় না। মাঝপথে প্রায়ই ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়। গন্তব্যে পৌঁছাতে কত সময় লাগবে তার কোনো নিশ্চয়তা থাকে না।
একই আক্ষেপ প্রকাশ করেন লালমনিরহাট-সান্তাহার রুটের যাত্রী সাফিয়া খাতুন। তিনি বলেন, ট্রেন যোগাযোগ সহজ করার কথা থাকলেও এখন সময় অনেক বেশি লাগছে। বগির ভেতরে লাইট ও ফ্যান নষ্ট থাকায় তাদের চরম কষ্ট করে চলাচল করতে হচ্ছে।
ট্রেনচালক আব্দুল মালেক জানান, এখানকার বেশিরভাগ ইঞ্জিন ২০০৪-২০০৫ সালের দিকের। একটি ইঞ্জিনে ছয়টি ট্রাকশন মোটর থাকার কথা থাকলেও পার্টস সংকটের কারণে অনেক সময় চার-পাঁচটি মোটর নিয়েই ট্রেন চালাতে হয়। এতে ইঞ্জিনের গতি মারাত্মকভাবে কমে যায়। হঠাৎ কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে তাৎক্ষণিক বিকল্প ইঞ্জিন বা পার্টস পাওয়াও দুষ্কর হয়ে পড়ে বলে তিনি জানান।
দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলের রেল অবকাঠামো উন্নয়ন বঞ্চিত বলে অভিযোগ করছে সচেতন নাগরিক সমাজ। লালমনিরহাটের বাসিন্দা মোস্তাফিজুর রহমান জিএস বাবু বলেন, লালমনিরহাট রেলওয়ে বিভাগ দীর্ঘকাল ধরেই উন্নয়ন বৈষম্যের শিকার। উত্তরাঞ্চলের রেল যোগাযোগের বড় অংশ এই বিভাগ দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হলেও এখানে সবসময় পুরনো ও জরাজীর্ণ ইঞ্জিন ও বগি পাঠানো হয়েছে। তিনি বর্তমান সরকারের কাছে দ্রুত এই বৈষম্য নিরসন করে নতুন ইঞ্জিন বরাদ্দের দাবি জানান।
লালমনিরহাট রেলওয়ের বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলী (লোকো) ধীমান ভৌমিক সমস্যার সত্যতা স্বীকার করে জানান, ২১টি মধ্যে ১৬টি ইঞ্জিন ইতিমধ্যে তাদের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল হারিয়েছে। মূলত নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করে এসব ইঞ্জিন কোনোমতে সচল রাখা হয়েছে। তিনি আরও জানান, ইঞ্জিনের এই সংকট বর্তমানে সারা দেশেই রয়েছে।
লালমনিরহাট রেলওয়ের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ তসলিম আহমেদ খান বলেন, সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তিনি জানান, ইঞ্জিন ও কোচের তুলনায় ওয়ার্কশপের সক্ষমতা অনেক কম। তবে ইঞ্জিন সংকট কাটাতে কবে নাগাদ কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে সেই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি।


